চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী সৈকতে পর্যটকদের জন্য দিন দিন বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি। সবুজ ঘাসের চাদরে ঢাকা এই সমুদ্রসৈকতের মাটির আঁকাবাঁকা ভাঁজে জোয়ারের পানি জমে ছোট ছোট দ্বীপের মতো দেখায়। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ঘেরা এই সৈকতে সন্ধ্যা নামলেই হরিণ দেখা যায়। কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে বিপদ।
বাড়ছে দুর্ঘটনা
গত তিন বছরে গুলিয়াখালী সৈকত এলাকায় সাগরে ডুবে মৃত্যু হয়েছে চার পর্যটকের। একই সময়ে সাঁতার কাটতে গিয়ে পর্যটক নিখোঁজ হওয়া এবং পরে উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ২০টির বেশি। উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সৈকত থেকে নির্বিচারে বালু তোলা, সাঁতার না জেনে পানিতে নামাসহ নানা কারণে ঝুঁকি বেড়েছে।
বালু তোলার কারণে গর্ত ও ঘূর্ণিপাক
উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, নির্বিচারে বালু তোলার কারণে সৈকতে ছোট–বড় অনেক গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্তে ভাটির পানির স্রোতে ঘূর্ণিপাকের সৃষ্টি হয়, যেখানে পর্যটকদের ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। গুলিয়াখালী সমাজকল্যাণ যুব সংঘের সভাপতি রমজান আলী বলেন, ‘২০১৯ সালের দিকে বাঁশবাড়িয়া থেকে নির্বিচারে বালু তোলা হচ্ছে। এর ফলে সৃষ্ট গর্তের ঘূর্ণিপাকে পর্যটকেরা নিখোঁজ হয়ে মারা যায়।’
সাঁতার না জানা ও স্রোত মোকাবিলায় ব্যর্থতা
সাঁতার না জেনে পানিতে নামার কারণে অনেকেই ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। আবার কেউ কেউ সাঁতার জানা সত্ত্বেও সাগরের স্রোত মোকাবিলা করতে পারেন না, যার কারণে সাগরে ভেসে যান। বিশেষ করে বর্ষার সময় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে। স্থানীয় প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে খেয়ালখুশিমতো দূরে চলে যাওয়াও ভেসে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে অভিমত ফায়ার সার্ভিস ও বাসিন্দাদের।
তরুণদের মধ্যে বেশি দুর্ঘটনা
এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন বলেন, ‘১৪ থেকে ২৪ বছর বয়সী কিশোর-তরুণেরা নিষেধাজ্ঞা মানতে চান না। তাঁরাই বিপদে পড়েন বেশি। এ ছাড়া পর্যটন এলাকা ঘোষণার চার বছরেও সৈকতের সব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত না করার কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে।’
প্রশাসনের পদক্ষেপ
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, গুলিয়াখালী সৈকতের বৈশিষ্ট্য কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটা থেকে আলাদা। এই সৈকতের তলদেশ অনেকটা এবড়োখেবড়ো। যার কারণে স্রোতের কবলে পড়ে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তিনি জানান, ‘দুর্ঘটনার সবগুলোই প্রায় একই স্থানে ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। দুর্ঘটনা কমানোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে লাল পতাকা টানানো হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গাছে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডও লাগানো হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় গ্রাম পুলিশরাও সব সময় সতর্ক অবস্থানে থাকেন।’
সাম্প্রতিক ঘটনা
গুলিয়াখালী সৈকত এলাকায় গত সোমবার চার পর্যটক সাঁতার কাটতে নেমে জোয়ারের পানির স্রোতে ভেসে যান। গ্রাম পুলিশের দুই সদস্য তাঁদের জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন। গত ২৩ মে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে আসা পাঁচ শিক্ষার্থী সাঁতার কাটার সময় ডুবে যেতে থাকেন। স্থানীয় বাসিন্দারা নৌকা নিয়ে চারজনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও রিফাত হোসেন (১৮) নামের একজন সাগরে নিখোঁজ হন। পরে ১৭ ঘণ্টা পর তাঁর লাশ উদ্ধার হয়।
২০২৩ সালের ৫ জুলাই সাঁতার কাটতে গিয়ে কুমিল্লা থেকে আসা দশম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হয়। তাদের একজন জীবিত উদ্ধার হলেও মেহেদী হাসান নামের এক শিক্ষার্থী মারা যায়। মেহেদী হাসান মারা যাওয়ার ১৯ দিন পর একই স্থানে গোসলে নেমে মোহাম্মদ আলী আহসান ও মো. এনায়েত উল্লাহ নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইআইইউসির দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হন। এর তিন ঘণ্টা পর তাঁদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ছাড়া প্রায়ই সাগরে ভেসে যাওয়া পর্যটকদের উদ্ধার করার ঘটনা ঘটে।
২০২২ সালের ১০ জানুয়ারি সৈকতটিকে পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে সরকার।



