পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) খাতে বরাদ্দের বণ্টন নিয়ে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ওয়াটারএইড বাংলাদেশের সাম্প্রতিক তথ্য উদ্বেগজনক। টানা তিন বছর নিম্নমুখী থাকার পর এই খাতে বরাদ্দের বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক; কিন্তু দেখা যাচ্ছে ওয়াশ খাতের মোট বরাদ্দের ৭২ শতাংশই চলে যাচ্ছে শহরাঞ্চলে। গ্রাম ও শহরের মধ্যকার বণ্টনের এই বৈষম্য আমাদের উন্নয়নের সামগ্রিক চিত্র উন্মোচিত করে দিয়েছে।
বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও বৈষম্য কাটেনি
প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে, গত অর্থবছরে ওয়াশ খাতে বরাদ্দ ১০ হাজার ৯০১ কোটি টাকা থাকলেও এবার তা বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা; কিন্তু এই বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও সবচেয়ে বঞ্চিত ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের লোকজন তুলনামূলক কম সুফল পাচ্ছেন। পিপিআরসির প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, শহরাঞ্চল ও ওয়াসাকেন্দ্রিক প্রকল্পের তুলনায় হাওর, চর ও উপকূল অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ অনেক কম।
এমনকি দেশের চারটি পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত বরাদ্দ ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক হলেও এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসা একাই পেয়েছে ৫ হাজার ১০ কোটি টাকা, যা মোট ওয়াশ এডিপি বরাদ্দের প্রায় ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ। উপরন্তু দেখা যায়, জরুরি দরকার এমন ক্ষেত্রগুলোতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত প্রকল্পে বড় অংশ ব্যয় করা হচ্ছে। অন্যদিকে বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ অধিকাংশ সিটি করপোরেশনেও বরাদ্দ কমেছে।
গ্রামীণ অঞ্চলে বরাদ্দ কমেছে
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের তথ্য বলছে, দেশের ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ এখনো নিরাপদ পানির সুবিধার বাইরে এবং ৬০ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। যেখানে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো তৈরিতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে নতুন অর্থবছরে ডিপিএইচইর বরাদ্দ কমে যাওয়াও উদ্বেগজনক। গ্রামীণ ও বঞ্চিত জনপদকে বঞ্চিত করে কেবল গুটিকয় মেগা শহরে কেন্দ্রীভূত বরাদ্দ কোনো কল্যাণকামী রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না।
পাশাপাশি পিপিআরসির প্রতিবেদনে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের ক্ষেত্রে বাজেটে মিশ্র চিত্রের কথা বলা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের বরাদ্দ বাড়ানো হলেও হাওর এলাকার জন্য কোনো পৃথক বরাদ্দ নেই। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় বরাদ্দ যেমন কমেছে এবং চরাঞ্চল বাজেট কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে বলে জানানো হয়েছে।
সুষম বণ্টনের বিকল্প নেই
উন্নয়নের মূল কথাই হলো সমতা, বৈষম্যমূলক উন্নয়ন দিন শেষে সম্পদকে যেমন পুঞ্জীভূত করে, তেমনি সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের কল্যাণ বয়ে আনে না। বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গ্রাম ও শহরের মধ্যে যে বৈষম্যমূলক চিত্র আমরা দেখি, ওয়াশ খাত এরই ধারাবাহিকতা। আমরা মনে করি, ওয়াশ খাতের বরাদ্দ বণ্টনপ্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই হবে না, বরং জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক ঝুঁকির অনুপাতে বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় মানুষের টেকসই স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে ডিপিএইচইর বরাদ্দও বাড়ানো উচিত বলে মনে করি। মূল উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে হাওর, উপকূল ও চরাঞ্চলকে গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে। তবে বরাদ্দের পাশাপাশি বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য সুষ্ঠু তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে।



