মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটে সবজির দামে রেকর্ড বৃদ্ধি
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটে সবজির দাম বৃদ্ধি

কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ তীব্র হওয়ার ফলে সৃষ্ট জ্বালানি তেলের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধি এবং শীত ও গ্রীষ্মের মধ্যবর্তী সময়ে সবজির উৎপাদন ঘাটতির প্রভাবে সম্প্রতি এগুলোর দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত করা ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গত দুই মাসে বগুড়া থেকে ঢাকা বা নোয়াখালীতে ট্রাকে করে সবজি পরিবহনের ভাড়া ৩০-৪০ শতাংশ বেড়েছে। এদিকে, উত্তরের সবজি বাণিজ্যকেন্দ্র বগুড়ার শিবগঞ্জের মহাস্থানে সবজির দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের স্বাভাবিকের চেয়ে ভালো খামার মূল্য পেলেও পরিবহন খরচ এবং বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যবসায়ীদের মুনাফা যোগ হওয়ায় শহরাঞ্চলের ভোক্তাদের অনেক বেশি দাম দিতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ২৪ এপ্রিল বগুড়া পাইকারি বাজারে ঢ্যাঁড়শ, করলা, মূলা, বেগুন ও বরবটির মতো সবজির বর্ধিত দাম প্রতি কেজি ২৫ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে ছিল। পরের সপ্তাহে ঢাকার কাঁচাবাজারগুলোতে এই সব সবজির দাম প্রতি কেজি ৬০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে রেকর্ড করা হয়।

কৃষকদের অবস্থা

জেলার শিবগঞ্জ থানার মহাস্থানের মাইনুল আহসান (৫০) দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে কৃষি খামার করেন। গত ২৪ এপ্রিল এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপচারিতায় তিনি জানান, নিজের ৫ বিঘা জমির সবটাতেই বছর জুড়ে সবজি চাষ করি। এক সবজি উঠতে না উঠতেই আরেক সবজি বুনি। জমি কখনও ফাঁকা থাকে না। অন্য যে কোনো ফসলের তুলনায় সবজি চাষে লাভ কয়েকগুণ বেশি। সে কারণে এ এলাকার ৯০ শতাংশ কৃষকই সবজি চাষ করে। তবে মাইনুল জানান, গত কয়েক বছরে সবজি চাষে জমির আওতা বাড়ার পাশপাশি উৎপাদন খরচও বেড়েছে অস্বাভাবিক মাত্রায়। সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধির চেয়েও কৃষিশ্রমিক পাওয়া ক্রমেই দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। তার সাথে ভরা মৌসুমে বীজ ও সার সঙ্কটে দিশা হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়। সম্প্রতি বাড়তি দর দিয়েও ডিজেল না পাওয়ায় জমিতে সেচ সমস্যার পাশাপাশি ট্রাকটর চালানো যাচ্ছে না। ফলে এবার সবজির উৎপাদন কম হয়েছে। কিন্তু চাহিদা স্বাভাবিক থাকায় সরবরাহ ভাটায় আমরা (কৃষক) সব সবজির ভালো দাম পেয়েছি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

একই থানার সুধামপুরের কৃষক মো. শাহজাহান আলী (৫৫) বরাবরের মতো এবারও তিন বিঘা জমিতে সবজি চাষ করেছেন। তিনি জানান, মার্চ-এপ্রিলের মধ্য সময়ে মহাস্থানের আড়তে সব রকম সবজির চাহিদা বেশি ছিল। পাইকার-আড়ৎদার আমাদের জমিতে এসে সবজি সংগ্রহ করেছেন। এতে স্বাভাবিক সময়ে যে মূলা ৫শ টাকা মণে বিক্রি হতো তা ১২শ টাকায়ও বিকিয়েছে। এক প্রশ্নোত্তরে শাহজাহান আলী জানান, বৈরী আবহাওয়ায় গত বছরের তুলনায় এবার সবজির উৎপাদন কম হয়েছে। এতে বাজারে সরবরাহে টান পড়েছে। ফলে আমাদের লাভের অংশ বড় হয়েছে। আবার যখন সবজির উৎপাদন বেশি হয়, কিন্তু বাজারে চাহিদা থাকে না তখন আমরা খরচও তুলতে পারি না। যেটি ঘটেছে আলুর ক্ষেত্রে। আলুচাষিদের গত বছরের ন্যায় এবারও বড় ধরনের লোকসান হয়েছে।

উৎপাদন খরচ ও চ্যালেঞ্জ

গড় মহাস্থানের সরকার পাড়ার কৃষক মো. আজিজুল হক (৪৪) বরাবরের মতো এবারও ৯ বিঘা খামারের দুই বিঘায় ধান আর বাকি ৭ বিঘাতে সবজি চাষ করেছেন। ধানের তুলনায় সবজি চাষে খরচ অনেক কম ছিল, কিন্তু গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে সবজি চাষেও খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। এর পরও আমরা বছরে এক জমিতে ৫ দফায় সবজি ফলাই। এক মৌসুমে বেশি দাম পেলে পরের মৌসুমে আরো বেশি জমিতে বেশি সবজি ফলাই। কিন্তু তখন আর দাম পাই না। এবার অবশ্য বৈরী আবহাওয়ায় উৎপাদনে বিপর্যয়ের পরও সবজির যে ফলন হয়েছে দাম পাওয়া গেছে তার দ্বিগুণ উল্লেখ করেন আজিজুল হক।

জেলার শাহজাহানপুর থানার মানিকদীপা উত্তর পাড়ার কৃষক মো. শাহ জামাল (৩৬) বছর জুড়ে ১২ বিঘা জমিতে ৪ ফসল করেন। তিনি বলেন, বেশি লাভের আশায় ধান-গমের পরিবর্তে বগুড়া অঞ্চলের কৃষকরা সবজি চাষ করলেও পরিস্থিতি ভিন্ন হতে শুরু করেছে। বিদ্যুৎ-জ্বালানির বাড়তি দাম ও দুঃষ্প্রাপ্যতা আমাদের (সবজিচাষিদের) বিপদে ফেলছে। বাড়তি পরিবহন খরচ সবজির দামে আঘাত করছে। ট্রাকের বাড়তি ভাড়া কৃষকের সবজির দাম কমিয়ে সমন্বয় করা হচ্ছে। দাম বাড়িয়ে হলেও বীজ, সার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিতে বিশেষ করে সবজি চাষে সময়মত সার, বীজ ও সেচ সুবিধা না পেলে উৎপাদন বিপর্যয় ঘটবে এবং সরবরাহ ঘাটতি প্রকট হবে। পরিণতিতে ভোক্তাদের চড়া মূল্য গুনতে হবে। মন্তব্য করেন সবজিচাষি শাহ জামাল।

ব্যবসায়ীদের মতামত

সবজির যোগান ও পরিবহন নিয়ে কথা হয় দেশে সবজি বিকিকিনির অন্যতম বৃহৎ মোকাম মহাস্থানের আড়ৎদার আলহাজ্ব সামাদ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. হারুন অর রশিদের সঙ্গে। এক যুগেরও বেশি সময়ের পেশাদার এই আড়ৎদার জানান, গত দু'মাস ধরে মোকামে সবজির আমদানি স্বাভাবিকের চেয়ে কম। কিন্তু চাহিদা আগের মতই থাকায় সরবরাহ ঘাটতি তৈরী হয়েছে। ফলে প্রতিদিন মোকামে আসা সবজির চেয়ে পাইকারদের চাহিদা বেশি থাকায় কৃষকরাও দাম বাড়িয়েছেন। এতে কৃষক পর্যায়েই সবজির দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। তার সাথে যুক্ত হয়েছে গাড়ি প্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া। সব মিলে ভোক্তা পর্যায়ে সবজির দাম অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়েছে।

সার মহাস্থানের অপর আড়ৎ বিশাল ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী মো: তাহেরুল ইসলাম (৪৬) জানান, দুই মৌসুমের মধ্যবর্তী সময়ে প্রতি বছরই সবজির উৎপাদন ও সরবরাহ ঘাটতি থাকে। কিন্তু এবার সার বীজের স্বল্পতা এবং সবজি উৎপাদনের প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বড় ধরনের উৎপাদন ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এতে যে কৃষক ৫ মণ বরবটি বা বেগুন নিয়ে মোকামে আসতেন এখন তিনি আনছেন ২ থেকে আড়াই মণ। সরবরাহ নেমেছে অর্ধেকে। ফলে ২৫ টাকা কেজির বরবটি কৃষকের কাছ থেকেই পাইকার কিনেছেন ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়। ৪০ টাকা কেজির সিম ৭৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা দরে। আর একই সময়ে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সঙ্কট এবং পরে দাম বাড়ানোয় পরিবহন ভাড়ায় বড় উল্ফলন হয়েছে। মহাস্থানের আড়ৎ থেকে নোয়াখালীর চৌমোহনীতে এক ট্রাক (১৫ টন) সবজি পরিবহনে আগে ২৫ হাজার লাগলে এখন লাগছে ৩৫ হাজার টাকা।

বগুড়া জেলায় সবজির অপর বড় বাজার নয় মাইল হাটের আড়তের ব্যবস্থাপক মশিউর রহমান জানান, আমরা ঢাকার কারওয়ান বাজার, সাভার, মিরপুরের আড়তে ২ মাস আগেও প্রতিদিন যে পরিমাণ সবজি পাঠাতাম এখন তার অর্ধেকও হয় না। কারণ, সবজির সরবরাহ কম। সবজির যোগান কম কিন্তু দাম বেশি। ৩০ টাকার দেশি ছোট করলা (উস্তা) কৃষকরাই বিক্রি করেছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। ২০ টাকার চিচিংগা এখনো ৪০ টাকায় কিনছেন পাইকার। বেশি দামে কেনা সবজি পরিবহন খরচও বেশি।