আমেরিকার বিখ্যাত গ্রেট লেকস এলাকায় হাঙর বা বিশাল স্কুইডের আক্রমণের ভয় নেই। তবে সেখানকার মিঠাপানিতে লুকিয়ে আছে অন্য এক বিপদ। সেখানে একধরনের আক্রমণাত্মক মাছ বাস করে, যাদের আকার প্রায় কুকুরের সমান। এদের নাম গ্রাস কার্প। এগুলো মূলত বাইরের দেশ থেকে আসা ক্ষতিকর মাছ। এক শ বছরের বেশি সময় ধরে এরা সেখানকার নদী ও হ্রদের পরিবেশ ধ্বংস করছে, সাবাড় করে দিচ্ছে অন্যান্য জলজ প্রাণীও। তবে আশার কথা হলো, সম্প্রতি এই ক্ষতিকর মাছ তাড়ানোর কাজে পরিবেশ কর্মকর্তারা বড় একটি সাফল্য পেয়েছেন।
ইলিনয় নদী থেকে অপসারণ
বিগত ১৫ বছরে বন্য প্রাণী কর্মকর্তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ইলিনয় নদী থেকেই প্রায় ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড আগ্রাসী কার্প মাছ ধরে সরিয়ে ফেলেছেন। ওজনের দিক থেকে এ বিশাল পরিমাণ মাছ প্রায় পাঁচ হাজার হাতির সমান। নদী ও হ্রদগুলোকে এই ক্ষতিকর বিদেশি মাছের হাত থেকে বাঁচাতে সব সরকারি সংস্থা মিলিয়ে একটি বড় যৌথ উদ্যোগ কাজটি করেছে। তাদের লক্ষ্য সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা।
চার প্রজাতির ক্ষতিকর মাছ
বর্তমানে গ্রেট লেকস ও এর আশপাশের এলাকার পানির পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে চার প্রজাতির ক্ষতিকর মাছ। এগুলো হলো বিগহেড কার্প, সিলভার কার্প, ব্ল্যাক কার্প ও গ্রাস কার্প। গ্রেট লেকস ফিশারি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০ সাল থেকে মাছ চাষের খামারগুলোয় ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ও শেওলা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে এই চার প্রজাতির মাছকে প্রথম উত্তর আমেরিকায় নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু খামারে আনার মাত্র ১০ বছরের মধ্যেই মাছগুলো আবদ্ধ জলাশয় থেকে কোনোভাবে পালিয়ে খোলা নদীতে চলে যায়। এরপর খুব দ্রুত এগুলো মিসিসিপি নদীর অববাহিকাসহ মিসৌরি ও ইলিনয়ের মতো বড় বড় নদীতে ছড়িয়ে পড়ে।
আকার ও খাদ্যাভ্যাস
এই চার প্রজাতির কার্প মাছ ওজনে একেকটি ১০০ পাউন্ড বা প্রায় ৪৫ কেজি বা এর চেয়ে বেশি হতে পারে। মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত প্রায় চার ফুট লম্বা। আকারে বড় হওয়ার পাশাপাশি এদের খাওয়ার ধরনও নদীর অন্যান্য মাছকে সংকটে ফেলে দেয়। বিগহেড ও সিলভার কার্প পানির ক্ষুদ্র প্ল্যাঙ্কটন বা কণা খেয়ে বেঁচে থাকে, যা মূলত সাধারণ ছোট মাছদের প্রধান খাবার। অন্যদিকে, গ্রাস কার্প অগভীর পানির শিকড়যুক্ত জলজ উদ্ভিদ খেয়ে ফেলে। আর ব্ল্যাক কার্প মূলত নদীর শামুক ও ঝিনুক খেয়ে বেঁচে থাকে। ফলে নদীর আদি ও সাধারণ মাছগুলো তীব্র খাদ্যসংকটে পড়ে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
পরিবেশের ওপর প্রভাব
ইউএসএর এনওএএ গ্রেট লেকস এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ ল্যাবের পরিবেশবিদ পিটার অ্যালসিপ এ মাছ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানান, এরা সংখ্যায় এত বেশি বাড়ে এবং এত বিপুল পরিমাণ খাবার খায় যে নদীর আদি ও স্থানীয় মাছগুলোর জন্য কোনো খাবারই অবশিষ্ট থাকে না। সিলভার কার্প মাছগুলো পানির ছোট ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও জুপ্ল্যাঙ্কটন খেয়ে ফেলে, যা মূলত পানির নিচের পুরো খাদ্যশৃঙ্খলের প্রধান ভিত্তি। ফলে এগুলো শেষ হয়ে গেলে পুরো জলজ পরিবেশেরই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
মানুষের জন্য বিপদ
আমেরিকার বন্য প্রাণী সেবা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এসব আগ্রাসী কার্প মাছ কোনো জলাশয়ে একবার ঢুকলে খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। খাবারের জন্য অন্য মাছদের সঙ্গে হয় তীব্র প্রতিযোগিতা। যেসব এলাকায় এদের সংখ্যা বেশি, সেখানে স্থানীয় মাছের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সাধারণ মানুষের বাণিজ্যিক বা শখের বশে মাছ ধরার কাজে বড় বাধা তৈরি হয়েছে। শুধু তা–ই নয়, এসব বিশাল আকারের মাছ মানুষের জন্যও বিপজ্জনক। কারণ, অনেক সময় নৌকা চলার শব্দে এগুলো হ্রদের পানি থেকে আচমকা ওপরের দিকে লাফিয়ে ওঠে। এতে নৌকায় থাকা মানুষের গায়ে সজোর আঘাত করে আহত করে।
প্রতিরোধ ব্যবস্থা
কার্প মাছের এই উপদ্রব থামাতে এবং এদের পুরোপুরি নির্মূল করতে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রচেষ্টার মধ্যে অন্যতম হলো নদী থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এই মাছ ধরে সরিয়ে ফেলা। নদীর নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় বিশেষ ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা ব্যারিয়ার তৈরি করা যেন এরা অন্য হ্রদে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। প্রতিনিয়ত নদীর পানির ওপর কড়া নজরদারি রাখা।
ইলেকট্রিক ব্যারিয়ার
ইলিনয় নদী থেকে যে ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড কার্প মাছ সরানো হয়েছে, সেটি মূলত একটি বিশেষ কর্মসূচির অংশ। পুরো অভিযানটি চালানো হয়েছে মিশিগান হ্রদ থেকে প্রায় ৫০ মাইল দূরে অবস্থিত নদীটির উত্তরাঞ্চলে। এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো ওই এলাকার প্রাপ্তবয়স্ক কার্প মাছগুলোর বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া, যাতে নদীর উজান বেয়ে ইলেকট্রিক ডিসপার্সাল ব্যারিয়ার সিস্টেমের দিকে এগোতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। মিশিগান হ্রদ থেকে প্রায় ৩৭ মাইল দূরে অবস্থিত এই বৈদ্যুতিক ব্যারিয়ার তৈরি করা হয়েছে মূলত শিকাগো অঞ্চলের নদীগুলোয় এই মাছের চলাচল আটকে দেওয়ার জন্য।
সাফল্য ও ভবিষ্যৎ
আমেরিকার বন্য প্রাণী সেবা সংস্থা তাদের একটি ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছে, নদী থেকে যত বেশি এই আগ্রাসী কার্প মাছ সরিয়ে ফেলা যাবে, জলজ পরিবেশের ওপর এদের ক্ষতিকর প্রভাব ততই কমবে। একই সঙ্গে মিশিগান হ্রদে এদের চলে যাওয়ার ঝুঁকিও পুরোপুরি কমে আসবে। নিয়মিত জলরাশি পর্যবেক্ষণ ও কার্পের বিস্তার রোধে নেওয়া এ সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারণেই ইলিনয় প্রশাসন ও আরও দুই ডজনের বেশি সহযোগী সংগঠন আমাদের মূল্যবান স্থানীয় মৎস্যক্ষেত্রগুলো টিকিয়ে রাখতে পেরেছে। এর ফলে গ্রেট লেকস অঞ্চলের অর্থনীতিও বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে সুরক্ষিত থাকছে।



