জাইকা ও সিডিএমপির এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে পরপর কয়েকটি মৃদু ভূমিকম্প এবং ফিলিপাইনসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনা বাংলাদেশেও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান বিবেচনায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা অমূলক নয়। আর এমন একটি দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে রাজধানী ঢাকা।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও মাঝেমধ্যে মৃদু থেকে মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে। ফলে যে কোনো সময় শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের মাত্রা ও তীব্রতা দুটোই বেশি হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ৬ থেকে ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প রাজধানীতে আঘাত হানলে অসংখ্য ভবন ধসে পড়তে পারে, প্রাণহানি ঘটতে পারে ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে কয়েক বিলিয়ন ডলারে।
মানবসৃষ্ট কারণ
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সম্ভাব্য এই বিপর্যয়ের জন্য শুধু প্রাকৃতিক কারণ নয়, মানবসৃষ্ট কারণও অনেকাংশে দায়ী। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিল্ডিং কোড উপেক্ষা করে নির্মিত দুর্বল ভবন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তদারকির ঘাটতি ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রকৌশলবিদ্যায় বহুল প্রচলিত একটি কথা হলো—‘ভূমিকম্প মানুষ মারে না, দুর্বল ভবনই মানুষকে মারে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫টি ভূমিকম্প ঘটে। অন্যদিকে কম্প্রিহেনসিভ আর্থকোয়াক ক্যাটালগ (কমক্যাট) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক তথ্যভান্ডারের তথ্যে দেখা যায়, প্রতিবছর গড়ে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ১৫ থেকে ১৬টি বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এসব তথ্যই প্রমাণ করে যে ভূমিকম্প পৃথিবীর স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও ঘনবসতিপূর্ণ নগরীতে এর প্রভাব হতে পারে ভয়াবহ।
ভূমিকম্পপ্রবণ বাংলাদেশ
ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ এমন একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা সবসময়ই রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের একটি ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ বা পুনরাবৃত্তি চক্র রয়েছে, যা সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর পরপর দেখা যায়। ইতিহাসে ১৭৬২ সালে আরাকান অঞ্চলে ৮ বা তার কাছাকাছি মাত্রার এবং ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮.১ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল। তবে এ ধরনের ভূমিকম্প কখন আবার ঘটবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
বুয়েট অধ্যাপকের বক্তব্য
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, দেশে ৭ থেকে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প যে কোনো সময় আঘাত হানতে পারে। অতীতের রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৮৬৯ সালে আসামের কাছাড়ে ৭.৫ মাত্রার, ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল ভূমিকম্পে ৭.১ মাত্রার, ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ মাত্রার এবং ১৯৩০ সালে ধুবড়িতে ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। এসব ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তির সময়কাল বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশে ৭ মাত্রার একটি বড় ভূমিকম্প এখন যে কোনো সময় ঘটতে পারে।
তিনি জানান, বাংলাদেশের চারপাশে বেশ কয়েকটি সক্রিয় চ্যুতি বা ফল্ট লাইন রয়েছে। ময়মনসিংহ থেকে সিলেট হয়ে ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাউকি ফল্টকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া আরাকান ফল্ট, নোয়াখালী থেকে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত প্লেট বাউন্ডারি এবং সিলেট থেকে কাছাড় অঞ্চলের প্লেট বাউন্ডারিগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ
সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরে মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, জাইকা ও সিডিএমপির এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর সুনির্দিষ্ট তালিকা এখনো প্রস্তুত করা হয়নি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ২১ লাখ বাসযোগ্য স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ ছোট ভবন, টিনশেড ঘর বা বস্তি, যেগুলো ভেঙে পড়লেও বহুতল ভবনের তুলনায় প্রাণহানির ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কিন্তু বাকি প্রায় ৬ লাখ বহুতল পাকা ভবনই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। এসব ভবনের অন্তত ৪০ শতাংশ চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য এই দুর্যোগ মোকাবিলায় এখনই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করা, নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। অন্যথায় একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প রাজধানী ঢাকা ও দেশের অন্যান্য শহরের জন্য ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।



