বিয়ের আনন্দে যাত্রা, কবরের পাশে কান্না: শ্বশুরের মর্মান্তিক বিলাপ
বাগেরহাটের রামপালে সংঘটিত এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত জামাতার কবর জিয়ারত করতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন শ্বশুর আবদুস সালাম। আজ শনিবার দুপুরে মোংলা সরকারি কবরস্থানে এই মর্মস্পর্শী দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছেন স্থানীয়রা। গতকাল শুক্রবার কয়রায় নিজের দুই মেয়ে, মা ও শাশুড়িকে দাফন শেষে আজ তিনি মোংলায় জামাতা আহাদুর রহমানের কবরে আসেন। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি অঝোর ধারায় কান্নায় ভেঙে পড়েন, যা দেখে উপস্থিত সকলের চোখে জল এসেছে।
একটি পরিবারের ধ্বংসস্তূপ
শনিবার বেলা ১১টার দিকে আবদুস সালাম কয়রা থেকে মোংলা সরকারি কবরস্থানে পৌঁছান। তিনি বৃহস্পতিবার তার মেয়েকে জামাতার বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন। দুই দিন পর তার মেয়েকে দেখতে আসার কথা ছিল, কিন্তু সেই দেখা হয়নি। দুই দিন পরে আজ ঠিকই এসেছেন, তবে জামাতার বাড়িতে নয়, বরং তার কবরের কাছে। এই ঘটনা পরিবারটির জন্য এক গভীর ট্র্যাজেডি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এর আগে বুধবার রাতে আবদুস সালামের মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয় বাগেরহাটের মোংলা পৌর শহরের শেহালাবুনিয়া এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের ছেলে আহাদুর রহমানের। বিয়ের পর ওই রাতে কনের বাড়িতে থাকার পর বৃহস্পতিবার নববধূসহ কয়রা থেকে মোংলায় বরের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন বরযাত্রীরা। দুর্ভাগ্যবশত, বিকেল চারটার দিকে বাগেরহাটের রামপালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন বর-কনেসহ মোট ১৪ জন।
শ্বশুরের হৃদয়বিদারক কথাবার্তা
আজ দুপুরে জামাতার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আবদুস সালাম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। বাবা মারা গেছে অনেক আগেই। মা ছিলেন। দুই মেয়ের সঙ্গে মা-টাও আমার চলে গেল। আমার তো সব শেষ।’ তার এই কথাগুলো শুনে উপস্থিত সকলের মন ভারী হয়ে উঠে।
আজ দুপুরে দুর্ঘটনায় নিহত বরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, যেখানে থাকার কথা ছিল বিয়ের আনন্দ, সেখানে এখন শুধুই শোক। কারও চোখে জল, কারও চোখমুখজুড়ে গভীর স্তব্ধতা। এখনো থামছে না স্বজনদের আহাজারি। দূরদূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়স্বজনেরা কিছুক্ষণ পরপরই ছুটে যাচ্ছেন কবরস্থানে। প্রিয়জনদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করছেন, কবরের মাটি ছুঁয়ে নিঃশব্দে কাঁদছেন। কবর জিয়ারত শেষে আবদুস সালাম জামাতার বাড়িতে আসেন। তাঁকে কাছে পেয়ে পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন, যা পরিবারের শোককে আরও গভীর করেছে।
একই পরিবারের নয়টি কবর
মোংলা কবরস্থানে পাশাপাশি নয়টি কবর একই পরিবারের সদস্যদের। তিন দিন আগেও যাঁরা ছিলেন আনন্দের উপলক্ষ, তাঁরা সবাই এখন কবরে। বরের পরিবারের নয়জনকে দাফন করা হয়েছে এই কবরস্থানে। কবরস্থানের কিছুটা দূরে বসে ছিলেন পরিবারের ৯ সদস্যকে হারানো আশরাফুল রহমান। তিনি বর আহাদুর রহমানের বড় ভাই। সবাইকে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে পেছনে মোটরসাইকেলে আসছিলেন। তিনি বলেন, ‘কিছুই তো আর অবশিষ্ট নেই। আমাদের আর কী বলার আছে? সব শেষ। তবে সরকারের কাছে একটা কথা বলতে চাই, খুলনা-মোংলা মহাসড়কে চলাচল করা সব যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।’
স্থানীয়দের উদ্বেগ ও দাবি
স্থানীয় বাসিন্দা জিহাদ হাওলাদার বলেন, খুলনা-মোংলা মহাসড়কের কয়েকটি জায়গা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত গতি নিয়ে যানবাহন চলাচল তো আছেই। এই সড়কেরও হয়তো কিছু ত্রুটি আছে। সড়কের বাঁক প্রশস্ত করা বা অন্য কোনো ত্রুটি থাকলে সেগুলো দূর করা হোক। এই দুর্ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো সম্প্রদায়ের জন্য এক মর্মান্তিক শোকের বার্তা বয়ে এনেছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জরুরি পদক্ষেপের দাবি উঠেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে।
