চীন ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ করছে? পশ্চিমা অভিযোগের ভিত্তিহীনতা বিশ্লেষণ
সম্প্রতি পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম ও গোয়েন্দা মহল থেকে একটি পরিচিত সুর বারবার শোনা যাচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সহায়তার জন্য চীন ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ করছে বা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ আলাপ যতটা নাটকীয়, ঠিক ততটাই বাস্তবতাবিবর্জিত। এটি মূলত পশ্চিমাদের একটি পরিচিত ছকে ফেলা সমীকরণ, যেখানে বোঝানো হয় বেইজিং পর্দার আড়ালের ইন্ধনদাতা, তেহরান চীনের স্বেচ্ছাধীন ঘুঁটি এবং মধ্যপ্রাচ্য পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বের দাবাখেলা।
পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি: জোটনিরপেক্ষতা
প্রথমত, চীনের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তির দিকে তাকানো যাক। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জোটনিরপেক্ষতা চীনের প্রধান পররাষ্ট্রনীতি। কয়েক দশক ধরে চীন সামরিক জোটে যোগ দেওয়া বা অন্য দেশের যুদ্ধে পক্ষ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। এটি কেবল কথার কথা নয়; কোরীয় উপদ্বীপ থেকে বলকান অঞ্চল পর্যন্ত এ নীতিই চীনা কূটনীতির মূল পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অক্ষের মধ্যকার সরাসরি সংঘাতে কোনো এক পক্ষকে অস্ত্র সরবরাহ করা চীনের জন্য স্পষ্টতই বড় ধরনের হস্তক্ষেপ, যা তাদের নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
সংলাপের মডেল ও বাস্তব উদাহরণ
দ্বিতীয়ত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি চীন কীভাবে সামলেছে, তা খেয়াল করুন। পশ্চিমা দেশগুলো যখন ইউক্রেনকে অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সহায়তা করেছে, চীন তখন ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধবিরতি ও শান্তিপূর্ণ আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। প্রবল চাপ সত্ত্বেও বেইজিং মস্কোকে কোনো মারণাস্ত্র পাঠায়নি। চীনের কাজের ধরন স্পষ্ট যে তারা বিশ্বাস করে সংঘাতের অবসান ঘটা উচিত আলোচনার টেবিলে, যুদ্ধ বাড়িয়ে নয়। ২০২৩ সালে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতাতেই ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলেছিল। তেহরানকে অস্ত্র দিলে তাদের দাঁড় করানো এ সংলাপের মডেল নিজেরাই ধ্বংস করে দেবে।
জ্বালানি নির্ভরতা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ
তৃতীয়ত, পশ্চিমা মহলগুলো প্রায়ই তেলনির্ভরতার যুক্তি দেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘চীন যেহেতু ইরানের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল, তাই নিজেদের সরবরাহ লাইন ঠিক রাখতে বেইজিং একসময় বাধ্য হয়ে তেহরানকে অস্ত্র দেবে।’ এ তত্ত্ব পশ্চিমাদের চরম কল্পনাশূন্যতা এবং চীনের জ্বালানি সক্ষমতার বিশালতাকে বুঝতে পারার ব্যর্থতাকেই সামনে নিয়ে আসে। এক দশক ধরে বেইজিং অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে তাদের জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য এনেছে। তারা বিশাল কৌশলগত তেলের মজুত গড়ে তুলেছে; রাশিয়া, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। চীন ইরানের তেলের কাছে জিম্মি নয়; বরং তারা বহু বিকল্প হাতে থাকা এক সুচতুর জ্বালানি ক্রেতা।
সার্বভৌম অধিকার ও গোয়েন্দা তথ্যের সীমাবদ্ধতা
চতুর্থত, এখানে সার্বভৌম অধিকারের বিষয়টিও জড়িত। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল দ্বন্দ্বের কোনো পক্ষ নয় চীন। একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে যেকোনো দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক ও বৈধ ব্যবসা পরিচালনার অধিকার বেইজিংয়ের রয়েছে। সাধারণ বাণিজ্যিক লেনদেনকে সামরিক সমর্থনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা বড় ধরনের যৌক্তিক ভুল। এছাড়া, সিএনএনের মতো পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ‘মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য’ ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে দাবি করা হয়, কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না, এই একই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই একসময় ইরাকে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ থাকার গল্প ফেঁদেছিল। ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর ইতিহাস তাদের বেশ পুরোনো।
চীনের দাপ্তরিক বক্তব্য ও যুক্তিবাদী বিশ্লেষণ
সর্বোপরি, চীনের নিজস্ব দাপ্তরিক বক্তব্যগুলোও আমাদের বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার এ অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছে। তারা দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিয়েছে, সক্রিয় কোনো সংঘাতে লিপ্ত পক্ষগুলোকে চীন কোনো মারণাস্ত্র সরবরাহ করে না। যুক্তিবাদী একটি বিশ্বে কোনো দেশের প্রকাশ্য ঘোষণার প্রতি ন্যূনতম সম্মান থাকা উচিত, বিশেষ করে যখন তাদের কথা ও কাজের মধ্যে মিল পাওয়া যায়। এ ধরনের ঘোষণাকে সম্পূর্ণ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বেনামি গোয়েন্দা তথ্য আঁকড়ে ধরে বসে থাকা কোনোমতেই সাংবাদিকতা নয়; বরং এটি স্রেফ কোনো পক্ষের হয়ে ওকালতি করা।
যেকোনো ষড়যন্ত্র-তত্ত্বের চেয়ে সত্য আসলে অনেক সহজ। আর সেটি হলো, ইরানকে অস্ত্র দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই চীনের নেই। এটি করলে তাদের লাভের চেয়ে ঝুঁকিই বেশি এবং তা তাদের নিজেদের নীতিরও ঘোর পরিপন্থী। নেলসন ওং, সাংহাই সেন্টার ফর রিমপ্যাক স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট, এ বিষয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত।



