ফ্রান্সে ইসলামের পদচারণা: তেরো শতাব্দীর ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
ফ্রান্সে ইসলামের পদচারণা: তেরো শতাব্দীর ইতিহাস

ফ্রান্সে ইসলামের উপস্থিতি কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। প্রায় তেরো শতাব্দী ধরে যুদ্ধ, অভিবাসন, উপনিবেশবাদ, সামাজিক পরিবর্তন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে ইসলাম ফরাসি সমাজে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে ফ্রান্স ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র এবং ইউরোপের বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। খ্রিষ্টধর্মের পর ইসলাম দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম।

উমাইয়া যুগে প্রথম আগমন

ফ্রান্সে ইসলামের প্রথম পদচিহ্ন অষ্টম শতাব্দীতে দেখা যায়। উমাইয়া খেলাফতের বাহিনী ইবেরিয়ান উপদ্বীপ জয় করার পর দক্ষিণ ফ্রান্সে প্রবেশ করে। ৭৩২ খ্রিষ্টাব্দে ট্যুরসের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পিছু হটলেও সেপ্টিমানিয়া অঞ্চলে তাদের প্রভাব ৭৫৯ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল। পরবর্তীতে আন্দালুসিয়ার মুসলিম শক্তি দক্ষিণ ফ্রান্সের ফ্রাক্সিনেটুম অঞ্চলে একটি শক্তিশালী দুর্গ গড়ে তোলে এবং ৮৮৭ সালে ‘আমিরাত অব ফ্রাক্সিনেট’ প্রতিষ্ঠা করে, যা ৯৭৫ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল।

মধ্যযুগ ও অটোমান প্রভাব

১৫৪৩-৪৪ সালে অটোমান নৌসেনাপতি খায়রুদ্দিন বারবারোসার নেতৃত্বে তুলোঁ শহর সাময়িকভাবে অটোমান নৌঘাঁটিতে পরিণত হয় এবং শহরের প্রধান ক্যাথেড্রালকে অস্থায়ীভাবে মসজিদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ১৬০৯ থেকে ১৬১৪ সালের মধ্যে স্পেন থেকে বিতাড়িত প্রায় ৫০ হাজার মরিস্কো ফ্রান্সে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঔপনিবেশিক যুগ ও মুসলিম উপস্থিতির বিস্তার

ফ্রান্সে স্থায়ী মুসলিম জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি শুরু হয় ঔপনিবেশিক যুগে। ১৮৩০ সালে আলজেরিয়া, ১৮৮১ সালে তিউনিসিয়া এবং ১৯১২ সালে মরক্কো ফরাসি শাসনের অধীনে আসে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় তিন লাখ উত্তর আফ্রিকান মুসলিমকে ফরাসি সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়। যুদ্ধ শেষে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ ফ্রান্সেই থেকে যান। মুসলিম সৈনিকদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯২০ সালে ফরাসি পার্লামেন্ট প্যারিসে একটি বৃহৎ মসজিদ নির্মাণের জন্য বিশেষ আইন পাস করে এবং ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক ‘গ্রান্দ মস্কে দ্য প্যারিস’।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও নতুন অভিবাসন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও মুসলিম অভিবাসন ত্বরান্বিত হয়। ১৯৪২ সালে উত্তর আফ্রিকায় মিত্রবাহিনীর অভিযানের পর প্রায় এক লাখ মুসলিম ফ্রি ফরাসি বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৪৫ সালে ফ্রান্সে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ, যা ১৯৬২ সালে আলজেরিয়ার স্বাধীনতার সময় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় চার লাখে।

হার্কি ও শ্রমিক অভিবাসনের প্রভাব

আলজেরিয়ার স্বাধীনতার পর মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে দুটি কারণ ছিল: হার্কিদের আগমন এবং শ্রমিক অভিবাসন। হার্কিরা ছিলেন আলজেরীয় মুসলিম যারা ফরাসি বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন; প্রায় ২০ হাজার হার্কি ও তাদের পরিবার ফ্রান্সে আশ্রয় নেন, মোট সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার। অন্যদিকে, যুদ্ধোত্তর শিল্পায়নের কারণে ১৯৬২ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ শ্রমিক, বিশেষ করে আলজেরিয়া ও মরক্কো থেকে, ফ্রান্সে পাড়ি জমান।

১৯৭৪: অভিবাসন নীতির মোড়

১৯৭৩ সালের তেল সংকটের পর প্রেসিডেন্ট ভালেরি জিসকার দ্যেস্তাঁ ১৯৭৪ সালে অর্থনৈতিক অভিবাসন সীমিত করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু বাস্তবে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিত ফল দেয়নি; বরং অনেক অভিবাসী স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৬ সালে পারিবারিক পুনর্মিলন নীতি কার্যকর হওয়ার পর মুসলিম পরিবারগুলোর আগমন আরও বৃদ্ধি পায়। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ ক্ষমতায় আসার সময় ফ্রান্সে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২০ লাখে পৌঁছে যায়।

বর্তমান ফ্রান্সে মুসলিম জনগোষ্ঠী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মুসলিম জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে: ১৯৪৫ সালে প্রায় ১ লাখ, ১৯৬০ সালে প্রায় ৪ লাখ, ১৯৭৫ সালে ১০ লাখের বেশি, এবং ১৯৯৯ সালে প্রায় ৪১ লাখ ৫৫ হাজার। ১৯৯৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী—আলজেরীয় ১৫,৫০,০০০; মরক্কান ১০,০০,০০০; তিউনিসিয়ান ৩,৫০,০০০; তুর্কি ৩,১৫,০০০; কৃষ্ণ আফ্রিকান ২,৫০,০০০; নবমুসলিম ৪০,০০০; অবৈধ অভিবাসী ৩,৫০,০০০; অন্যান্য ২,০০,০০০; মোট ৪১,৫৫,০০০। ২০১৯-২০ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফ্রান্সের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ শতাংশ মুসলিম, যা ১৯৮৫ সালে ছিল মাত্র ০.৫ শতাংশ।

ভৌগোলিক অবস্থান ও মসজিদ

মুসলিম জনগোষ্ঠী মূলত বড় শহরকেন্দ্রিক: প্যারিস ও আশপাশের ইল-দ্য-ফ্রাঁস অঞ্চলে প্রায় ৩৮ শতাংশ, মার্সেই ও নিস অঞ্চলে প্রায় ১৩ শতাংশ, এবং লিওঁ ও গ্রেনোবল অঞ্চলে প্রায় ১০ শতাংশ মুসলিম বসবাস করেন। ২০০১ সালে ফ্রান্সে ১,৫৫৮টি নামাজের স্থান ছিল, যা ২০০৮ সালে বেড়ে প্রায় ২,১২৫-এ পৌঁছায়। ২০০২ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোলা সারকোজি ফরাসি মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বের জন্য কনসেই ফ্রঁসে দ্যু ক্যুল্ত মুসলমান গঠনের উদ্যোগ নেন।

ধর্মীয় চর্চায় জাগরণ

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ধর্মীয় অনুশীলনের হার বৃদ্ধি পেয়েছে: প্রতিদিন নামাজ আদায় ১৯৮৯ সালে ৪১% থেকে ২০২৫ সালে ৬২%, জুমার নামাজে অংশগ্রহণ ১৬% থেকে ৩৫%, এবং রমজানের রোজা পালন ৬০% থেকে ৭৩% হয়েছে।

লায়িসিতে ও হিজাব বিতর্ক

ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি মুসলিম সমাজের সঙ্গে সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে। ১৯৮৯ সালে হিজাব পরার কারণে কয়েকজন মুসলিম ছাত্রীকে স্কুল থেকে বহিষ্কারের ঘটনা জাতীয় বিতর্কে পরিণত হয়। ২০০৪ সালে স্কুলে দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীক নিষিদ্ধ করার আইন পাস হয়, যার আওতায় হিজাবও পড়ে। তবে রাষ্ট্রকে হালাল খাদ্য, কবরস্থান, কারাগারে ইমাম নিয়োগ এবং ধর্মীয় সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কেও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

অতীতের ক্ষত ও পুনর্মিলন

আলজেরিয়া যুদ্ধ এবং ঔপনিবেশিক ইতিহাসের স্মৃতি আজও গুরুত্বপূর্ণ। প্যারিসের বিভিন্ন স্থানে নিহত মুসলিম সৈনিক ও আলজেরীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকদের স্মরণে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে। হার্কিদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয় সম্মান দিবস চালু করা হয়েছে।

ফ্রান্সে ইসলামের ইতিহাস কেবল অভিবাসনের ইতিহাস নয়; এটি সভ্যতা, যুদ্ধ, ত্যাগ, সহাবস্থান এবং পরিচয়ের দীর্ঘ অভিযাত্রা। ভবিষ্যতে ফরাসি সমাজ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও সহাবস্থানের মাধ্যমে আরও গভীর ও অর্থবহ হয়ে উঠবে—এটাই প্রত্যাশা।