চীনের উন্নয়ন: দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তববাদী নীতির সাফল্য
চীনের উন্নয়ন: দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তববাদী নীতি

বিকেল সাড়ে পাঁচটা। চীনের জিয়াংসু প্রদেশের একটি রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি। প্ল্যাটফর্মে মানুষের ভিড় আছে, কিন্তু কোনো হুড়োহুড়ি নেই। নির্ধারিত সময়ের এক মিনিট আগেই হাইস্পিড ট্রেনটি এসে থামল। যাত্রীরা দ্রুত উঠে বসলেন, দরজা বন্ধ হলো, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটার ছুঁয়ে ফেলল। বাংলাদেশ থেকে আসা একজন শিক্ষার্থী হিসেবে প্রথম দিকে বিষয়টি আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। কয়েক শ কিলোমিটারের পথ মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টায় পাড়ি দেওয়া শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, এটি আসলে একটি দেশের পরিকল্পনা, শাসনব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। আজকের চীনকে বোঝার জন্য শুধু তার সুউচ্চ অট্টালিকা, স্মার্ট সিটি কিংবা ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে তাকালেই হবে না। বুঝতে হবে, কীভাবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি কয়েক দশকের মধ্যে দারিদ্র্যপীড়িত কৃষিভিত্তিক দেশ থেকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পশক্তিতে পরিণত হলো।

সংস্কারের শুরু: মতাদর্শ নয়, ফলাফলই মুখ্য

১৯৭৮ সালে চীনের অর্থনীতি ছিল স্থবির। মাথাপিছু আয় ছিল খুবই কম, শিল্পোৎপাদন সীমিত আর অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করতেন। সেই সময় চীনের নেতা দেং শিয়াওপিং একটি বাস্তববাদী দর্শন সামনে আনেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল, 'বিড়াল সাদা না কালো, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো সে ইঁদুর ধরতে পারে কি না।' এই দর্শনের অর্থ ছিল সহজ কোনো নীতি আদর্শগতভাবে কতটা আকর্ষণীয়, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারছে কি না। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একাদশ কেন্দ্রীয় কমিটির তৃতীয় পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতি, যা চীনা ভাষায় গাইগে কাইফাং নামে পরিচিত। চীনের আরেকটি বহুল প্রচলিত নীতি ছিল বড় কোনো পরিবর্তনের আগে ছোট পরিসরে পরীক্ষা, ফলাফল মূল্যায়ন ও তারপর ধীরে ধীরে সম্প্রসারণ। এই ধীর কিন্তু ধারাবাহিক পদ্ধতিই চীনের উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গ্রাম থেকে শহর: উন্নয়নের যাত্রা

চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের সূচনা হয়েছিল গ্রামাঞ্চল থেকে। 'হাউসহোল্ড রেসপনসিবিলিটি সিস্টেম' চালুর মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদনে স্বাধীনতা দেওয়া হয়। সরকার নির্ধারিত কোটার অতিরিক্ত ফসল কৃষকেরা বাজারে বিক্রি করতে পারতেন। ফলাফল ছিল চোখে পড়ার মতো। কৃষি উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পেল, কৃষকদের আয় বাড়ল ও গ্রামীণ অর্থনীতি নতুন গতি পেল। চীনের উন্নয়নের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এটিই, উন্নয়ন শুধু বড় শহর দিয়ে শুরু হয় না, শুরু হয় মানুষের জীবনের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার মধ্য দিয়ে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চীনের দক্ষিণাঞ্চলের শেনজেন শহরে গেলে বোঝা যায়, পরিকল্পিত নীতিনির্ধারণ কতটা গভীর পরিবর্তন আনতে পারে। ১৯৮০ সালে এটি ছিল একটি ছোট মৎস্যজীবীদের গ্রাম। আজ এটি বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিকেন্দ্র। এখানেই গড়ে উঠেছে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের অনেকটি। স্মার্টফোন, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, টেলিযোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই শেনজেন এখন উদ্ভাবনের কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা এসইজেড গঠনের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর–সুবিধা প্রদান ও রপ্তানিমুখী শিল্পায়নকে উৎসাহিত করা হয়েছিল। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শেনজেনের উদাহরণ প্রায়ই সামনে আসে। কারণ, এটি দেখিয়েছে যে সঠিক নীতি, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সক্ষমতা থাকলে একটি অঞ্চল পুরো দেশের অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে।

চীনের শাসনব্যবস্থা: দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার শক্তি

চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বে নানা বিতর্ক রয়েছে, তবে একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চীনের সক্ষমতা অসাধারণ। ৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি দেশটি ১৫, ২০ এমনকি ৩০ বছরের উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ করে। 'মেড ইন চায়না ২০২৫', 'ডিজিটাল চায়না' ও 'কার্বন নিউট্রালিটি ২০৬০'—এসব উদ্যোগ শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এগুলোর সঙ্গে নির্দিষ্ট বাজেট, সময়সীমা ও বাস্তবায়ন কাঠামো যুক্ত আছে। চীনের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি প্রাদেশিক প্রশাসন, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে নীতিগুলো প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

চীনে বসবাস করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি যেটি চোখে পড়ে, সেটি হলো অবকাঠামোর বিস্তার। শুধু বড় শহর নয়, অপেক্ষাকৃত ছোট শহরগুলোতেও আধুনিক সড়ক, রেলপথ, মেট্রো, বিমানবন্দর ও ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। চীনের হাইস্পিড রেল নেটওয়ার্ক বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দ্রুত যাতায়াত এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ। অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে শুধু ভ্রমণ সহজ হয়নি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক সংযোগ ও বিনিয়োগও বেড়েছে। একসময় যেসব অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে ছিল, সেগুলোও এখন জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে, অবকাঠামো শুধু নির্মাণ প্রকল্প নয়, এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি।

দারিদ্র্য হ্রাস: চীনের উন্নয়ন

চীনের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। গত চার দশকে দেশটি প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই সাফল্যের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, ছিল লক্ষ্যভিত্তিক নীতি। কোন অঞ্চলে কত মানুষ দরিদ্র, তাদের আয় কত, কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, এসব তথ্য সংগ্রহ করে স্থানীয় পর্যায়ে নির্দিষ্ট কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কখনো অবকাঠামো উন্নয়ন, কখনো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কখনো শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দারিদ্র্য মোকাবিলা করা হয়েছে। চীনের অভিজ্ঞতা দেখায়, দারিদ্র্য বিমোচন শুধু অর্থনৈতিক সূচকের বিষয় নয়, এটি প্রশাসনিক সক্ষমতা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিষয়ও।

প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন

চীনে নতুন আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা। কখনো কখনো পুরো দিন পকেটে টাকা না রেখেও অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া যায়। রাস্তায় ফল বিক্রেতা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানটিন—সব জায়গায় কিউআর কোড স্ক্যান করলেই পেমেন্ট সম্পন্ন হয়ে যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ই-কমার্স, ফিনটেক, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রতিটি ক্ষেত্রেই চীন ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। আজকের চীন শুধু 'বিশ্বের কারখানা' নয়, এটি দ্রুত 'বিশ্বের উদ্ভাবনকেন্দ্রে' পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে।

বেল্ট অ্যান্ড রোড: সংযোগের নতুন ভূরাজনীতি

২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই ঘোষণা করেন। এর লক্ষ্য হলো সড়ক, রেল, বন্দর, জ্বালানি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা। সমর্থকদের মতে, এটি বৈশ্বিক সংযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করছে। অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, কিছু দেশে ঋণের চাপ ও কৌশলগত নির্ভরতা বাড়তে পারে। বাস্তবতা হলো বিআরআই এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক উদ্যোগ।

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: সম্ভাবনার নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক গত এক দশকে আরও গভীর হয়েছে। বাণিজ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ছে। চীনে পড়াশোনা করতে এসে আমি দেখেছি, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেকে প্রকৌশল, চিকিৎসা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবসা প্রশাসনের মতো বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। তাঁদের অনেকের বিশ্বাস, চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এখানেও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি কোনো দেশের উন্নয়ন মডেল হুবহু অনুকরণ করা যায় না। বাংলাদেশকে তার নিজস্ব বাস্তবতা, জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো বিবেচনা করেই উন্নয়নের পথ নির্ধারণ করতে হবে। চীনের উন্নয়নের গল্প আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নীতির ধারাবাহিকতা ও বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে কি উন্নয়নকে আরও গতিশীল করা সম্ভব? বাংলাদেশের সামনে এখন নতুন সুযোগ ও নতুন চ্যালেঞ্জ—দুটিই রয়েছে। চীন দেখিয়েছে, অবকাঠামো, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ করলে কয়েক দশকের মধ্যেই বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে সেই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও নীতির ধারাবাহিকতা।

জিয়াংসুর সেই রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে দ্রুতগতির ট্রেনটি যখন দিগন্তের দিকে ছুটে যাচ্ছিল, তখন মনে হয়েছিল, উন্নয়ন আসলে গন্তব্য নয়, এটি একটি দীর্ঘযাত্রা। আর সেই যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি দেশ কত দ্রুত দৌড়ায় তা নয়, বরং কতটা ধারাবাহিকভাবে নিজের লক্ষ্য পথে এগিয়ে যেতে পারে।