যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির পরও কেন ফের বাড়ল তেলের দাম?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে। মূলত লেবাননে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া এবং পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক ধীরগতিতে হওয়ার কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের প্রধান মানদণ্ড ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর মূল্য আজ শুক্রবার (১৯ জুন) শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ দিনের শুরুর দিকে এর দাম প্রায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ কমে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ সমাপ্তি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সমঝোতা স্মারকটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের চুলচেরা বিশ্লেষণের মধ্যেই তেলের বাজারে এই ওঠানামা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগামী আগস্ট মাসে সরবরাহের চুক্তিতে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বর্তমানে ৮০ দশমিক ৩৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বুধবারের (১৭ জুন) পর এবারই প্রথম ৮০ ডলারের গণ্ডি পার হলো।
তেলের দামের এই আকস্মিক বৃদ্ধির পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি বড় ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি লেবাননে ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলায় ১৬ জন নিহত হয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর অস্ত্রবিরতি চুক্তিকে নতুন করে হুমকির মুখে ফেলেছে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম জানায়, আজ শুক্রবার (১৯ জুন) দক্ষিণ ইসরাইলে হিজবুল্লাহ বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে চার ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন। এই হামলার জেরে সুইজারল্যান্ডে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের একটি পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক এই অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে এশিয়ার শেয়ার বাজারগুলোতেও। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার পুঁজিবাজারে আজ তীব্র ওঠানামা দেখা গেছে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে খুব সীমিত পরিসরে জ্বালানি পরিবহন শুরু হয়েছে। মেরিটাইম অ্যানালিটিক্স ফার্ম কেপলার জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সৌদি আরবের পতাকাবাহী তিনটি সুপারট্যাংকার প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। জাহাজগুলো কয়েক সপ্তাহ ধরে পারস্য উপসাগরে তাদের ট্র্যাকিং সিস্টেম (ট্রান্সপন্ডার) বন্ধ করে অবস্থান করছিল। এছাড়া হংকংয়ের একটি তেল ট্যাংকার এবং ফ্রান্সের একটি এলএনজি ট্যাংকারও এই নৌপথ পার হয়েছে।
তবে কয়েকটি জাহাজের এই যাতায়াত সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি যুদ্ধের আগের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। স্বাভাবিক সময়ে এই চ্যানেল দিয়ে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৩০টি জাহাজ চলাচল করত, যার মাধ্যমে বিশ্বের মোট তেলের চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে প্রায় ৫০০-এর বেশি জাহাজ পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার জন্য প্রণালিটির মুখে অপেক্ষা করছে।
যদিও ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই নৌপথটি পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবুও জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো তাদের নৌযান এবং ক্রুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলে জাহাজের ওপর অন্তত ৪৬টি হামলা হয়েছে, যাতে ১৪ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া প্রণালিতে ইরানের পেতে রাখা নৌ-মাইনের উপস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে, যা পরিষ্কার করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে।
ট্যাংক মালিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ইন্টারট্যাঙ্কো’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিম উইলকিন্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, নিরাপদ যাতায়াতের স্পষ্ট রূপরেখা না পাওয়া পর্যন্ত অনেক জাহাজ মালিকই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহারে দ্বিধাবোধ করছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি ইতিবাচক মনে হলেও নাবিকদের সুরক্ষার বিষয়টিই এখন সবার আগে প্রাধান্য পাচ্ছে।
সূত্র: আল-জাজিরা।



