যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের দ্বৈত সমীকরণ
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তিটি ব্যাপক আগ্রহ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে, অন্যদিকে এর কঠিন শর্ত ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

চুক্তির মূল উপাদান ও বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক এই বাণিজ্যচুক্তি একটি আদর্শ সমঝোতা হিসেবে উপস্থাপন করা চ্যালেঞ্জিং। এটি একটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল চুক্তি, যা প্রচলিত শুল্কভিত্তিক বাণিজ্যচুক্তির চেয়ে বেশি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে। এতে রয়েছে শুল্ক হ্রাস, আমদানি লাইসেন্সিং, মানদণ্ড, ডিজিটাল বাণিজ্য, শ্রম, পরিবেশ, বিনিয়োগ, জাতীয় নিরাপত্তা, সরকারি ক্রয় এবং নিষেধাজ্ঞা-সম্পর্কিত সহযোগিতা।

চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ মুহূর্তে, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে। ফলে এর সময়োপযোগিতা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি মাত্রার কমপ্লায়েন্সের দায় বর্তায়। চুক্তিটি ওয়াশিংটনকে বিভিন্ন প্রয়োগক্ষমতা দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে চুক্তি বাতিল ও পুনরায় শুল্ক আরোপের বিধান। কিছু ক্রয়-প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে বাস্তবায়িত হলে তা বৈদেশিক মুদ্রা ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্যিক গুরুত্ব

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য আর পাঁচটি রপ্তানি গন্তব্যের মতো নয়। ইউএসটিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে আমদানি করেছে ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য এবং বাংলাদেশে রপ্তানি করেছে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ছিল ৮ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৮ শতাংশ। এর মধ্যে ছিল ৪ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারের ওভেন পোশাক এবং ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের নিটওয়্যার।

এটি কোনো প্রান্তিক বাজার নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য এটি একক দেশভিত্তিক বৃহত্তম চাহিদার উৎস। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থান, শিপিং, ব্যাংকিং, প্যাকেজিং, অ্যাকসেসরিজ এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প। এ বাজারে প্রতিযোগিতা হারানো বা কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া একটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থান সংকট সৃষ্টি করবে।

শুল্ক পরিস্থিতি ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান

১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক এবং পরবর্তী সময়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর কার্যকর হওয়া ১০ শতাংশ শুল্ক সুখবর নয়, তবে এটি উচ্চ শুল্কের হুমকি ও দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার চেয়ে ভালো। বাণিজ্য আলোচনায় কখনো কখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টিকে থাকার জায়গা ধরে রাখা। এই চুক্তি অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি কমানোর একটি সুযোগ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের ওপর আরোপিত ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সমপর্যায়ে ছিল; ভিয়েতনামের ২০ শতাংশের চেয়ে কম এবং ভারতের ১৮ শতাংশের তুলনায় সামান্য বেশি (বর্তমানে সব দেশই ১০ শতাংশ শুল্কের আওতায় রয়েছে)। অর্থাৎ বাংলাদেশ কোনো বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পায়নি, তবে বড় কোনো অসুবিধায় পড়েনি। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা নির্দিষ্ট কিছু পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য, যদি সেগুলোতে মার্কিন উৎসের তুলা বা কৃত্রিম তন্তু ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেগুলো শূন্য পারস্পরিক শুল্কসুবিধা পেতে পারে। তবে স্বাভাবিক মার্কিন এমএফএন শুল্ক তখনো প্রযোজ্য থাকতে পারে।

কমপ্লায়েন্স ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ

এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সুযোগ শুল্কে নয়, বরং বিনিয়োগ ও বাণিজ্য পরিবেশের সংস্কারে। চুক্তিতে আইন ও নীতিগত স্বচ্ছতা, অনলাইনে বিধি প্রকাশ, জনপরামর্শ, রেগুলেটরি ইমপ্যাক্ট অ্যানালাইসিস, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক মান-সনদের গ্রহণযোগ্যতা, ডিজিটাল কাস্টমস, কাগজবিহীন বাণিজ্য এবং ২০৩০ সালের মধ্যে প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং চালুর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রম খাতে সংগঠন করার স্বাধীনতা, ইপিজেডে শ্রমিক অধিকার, নিয়মিত মজুরি পুনর্বিবেচনা, শ্রম পরিদর্শন শক্তিশালীকরণ এবং অন্যায্য শ্রমচর্চার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আজকের বিনিয়োগকারীরা শুধু মজুরি খরচ দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন না। সময়মতো পণ্য সরবরাহ, লজিস্টিক সক্ষমতা, শ্রম পরিবেশ ও শ্রম-অসন্তোষের ঝুঁকি, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের দক্ষতা, চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতা, ডেটা নীতি, দুর্নীতির ঝুঁকি এবং নিয়ন্ত্রক পূর্বানুমান যোগ্যতা—এসব বিষয় বিবেচনা করেই বিনিয়োগকারীরা, বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা, তাঁদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে থাকেন।

বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির ধাপ কেবল স্বল্পমূল্যের উৎপাদনের ওপর নির্ভর করতে পারে না, প্রয়োজন আরও বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো এবং সেবা খাতের গভীরতা। আঙ্কটাডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে মোট এফডিআই স্টক প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের আশপাশেই স্থির রয়েছে।

মার্কিন বিনিয়োগের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে মার্কিন নিট এফডিআই ছিল ঋণাত্মক ১৩২ মিলিয়ন ডলার। এই জায়গাতেই চুক্তিটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি এবং নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ, এভিয়েশন সাপ্লাই চেইন, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন এবং লজিস্টিকস অবকাঠামো খাতে মার্কিন বিনিয়োগ সহজতর করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন এক্সিম ব্যাংক এবং ডিএফসির সম্ভাব্য সহায়তার কথাও উল্লেখ আছে।

ব্যয়ের দিক ও চুক্তির ভবিষ্যৎ

চুক্তির আওতায় বিমান, এলএনজি, গম, সয়াবিন, তুলা এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের বড় প্রতিশ্রুতি রয়েছে। যদি মার্কিন সরবরাহকারীরা প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, মান এবং সরবরাহ নিশ্চয়তা দিতে পারে, তাহলে কেনা উচিত। কিন্তু রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের জন্য গোপন ভর্তুকি বা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্কব্যবস্থার আইনি ভিত্তি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন যে আইইইপিএএর আওতায় চ্যালেঞ্জকরা শুল্ক আরোপ করা যায় না। এরপর মার্কিন প্রশাসন ট্রেড অ্যাক্ট অব ১৯৭৪–এর ১২২ ধারার আওতায় অস্থায়ী ১০ শতাংশ শুল্ক এবং ভবিষ্যতে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা বলেছে। এ ছাড়া জোর করে শ্রম প্রতিরোধে ব্যর্থ দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সম্ভাবনার কথাও ইউএসটিআর ইঙ্গিত দিয়েছে।

চুক্তিটি নিখুঁত নয়, আবার একেবারে মূল্যহীনও নয়। এতে ঝুঁকি আছে, সুযোগও আছে। বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ হলো, এটি যেন কেবল চাপের মুখে পাওয়া একটি শুল্কছাড় হিসেবেই না থেকে যায়; বরং বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।