প্রবাসী আয়ে রেকর্ড ৩৫ বিলিয়ন ডলার, রপ্তানি কমেছে সাড়ে ৩ শতাংশ
প্রবাসী আয়ে রেকর্ড ৩৫ বিলিয়ন ডলার, রপ্তানি কমেছে

মধ্যপ্রাচ্যের বড় সংকটের মধ্যেও দেশে প্রবাসী আয় এসে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। গত ১২ মাসে প্রবাসীরা প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন, যা স্বাধীনতার পর আর কখনো আসেনি। এই আয়ের ওপর ভর করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেরও উন্নতি হয়েছে; বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার। তবে পণ্য রপ্তানিতে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে পণ্য রপ্তানি কমেছে প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ।

প্রবাসী আয়ে রেকর্ড

দুই বছর আগে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রবাসী আয়ে বড় উল্লম্ফন দেখা যায়। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংক মাধ্যমে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি হয় প্রায় ২৭ শতাংশ, এবং প্রথমবারের মতো তা ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। সেই ধারাবাহিকতায় সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয়ে নতুন রেকর্ড হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত প্রতি মাসে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয় এসেছে। ২৭ জুন পর্যন্ত মোট ৩৫ দশমিক ২০ বিলিয়ন (৩ হাজার ৫২০ কোটি) ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি।

রিজার্ভের উন্নতি

প্রবাসী আয়ের ভালো প্রবৃদ্ধির কারণে রিজার্ভ বেড়েছে। গত বছরের ৩০ জুন মোট রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে আইএমএফের হিসাবপদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ২৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। গত মাসে মোট রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলার, এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ বেড়ে ৩১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। তবে রিজার্ভ বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কম, যা আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে বাধ্য হওয়ায় রিজার্ভের ওপর চাপ পড়েছে, অন্যথায় রিজার্ভ আরও বেশি থাকত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পণ্য রপ্তানি কমছে

সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই–মে) ৪ হাজার ৩৮০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আড়াই শতাংশ কম। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, গত জুলাইয়ে ৪৭৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, জানুয়ারি, এপ্রিল ও মে মাসে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি, বাকি মাসগুলোয় ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানিকারকেরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং ইউরোপের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হলে সংকট আরও প্রকট হয়, ফলে শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের ঘটনা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞ মতামত

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “প্রবাসী আয় বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হুন্ডিতে অর্থ আসা কমে যাওয়া। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার হতো। এ ছাড়া বৈধ ও অবৈধ পথে ডলারের দামের পার্থক্য কমে এসেছে। পাশাপাশি বৈধ পথে আয় পাঠানো ও গ্রহণ সহজ হয়েছে। ফলে প্রবাসী আয় আসা বেড়েছে। এই ধারা বহাল রাখতে নতুন বাজার খোঁজা ও দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।”

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, “বিশ্ববাজারে একধরনের মন্দাভাব রয়েছে। সেখানে আমাদের করণীয় সীমিত। তবে চীন ইইউর বাজারে যেভাবে আগ্রাসী বিপণন করছে, আমাদেরও তেমন করতে হবে। তা না হলে আমাদের বাজার হারানোর প্রবণতা বাড়বে। আগ্রাসী বিপণনের জন্য প্রথমে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সরকারের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। প্রতিযোগিতাসক্ষমতা ও পণ্যবৈচিত্র্য আনতে উদ্যোক্তাদের চেষ্টা বাড়াতে হবে। এ জন্য সরকারকেও সব ধরনের সহায়তা দিতে হবে।”

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ব্যাংকার, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ হলে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির সুযোগ বাড়বে। বিশ্ববাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়লে পণ্য রপ্তানি পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে, যদিও ইইউতে প্রতিযোগিতা বাড়বে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের সমাধান না হলে শেষ পর্যন্ত সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে যাবে।