পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তিচুক্তি
সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক হোটেল কমপ্লেক্সে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল–থানির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। মাত্র কয়েক মিটার দূরে ছিলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। বক্তব্য শুরু করে ভ্যান্স মুনিরের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘গত এপ্রিলে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির যখন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে নিয়ে ইসলামাবাদে আমাদের স্বাগত জানিয়েছিলেন, তখন থেকেই আমি রসিকতা করে আসছি, আমার জীবনে দুজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আছেন—একজন ভারতীয় ও একজন পাকিস্তানি। ভারতীয় সেই ব্যক্তি হলেন আমার স্ত্রী আর পাকিস্তানের ব্যক্তি হলেন ফিল্ড মার্শাল মুনির।’ এ কথায় পুরো কক্ষে হাসির রোল পড়ে যায়।
মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের ভূমিকা
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের স্ত্রী উষা ভ্যান্স একজন ভারতীয় অভিবাসী দম্পতির মেয়ে। ভ্যান্স আরও বলেন, গত তিন মাসে তিনি অন্য যে কারও চেয়ে জেনারেল মুনিরের সঙ্গে বেশি কথা বলেছেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করে বলেন, ‘তাঁর দূরদর্শিতা ও সামরিক নেতৃত্ব না থাকলে আমরা আজ এখানে পৌঁছাতে পারতাম না।’
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গত সোমবার ইসলামাবাদে রাষ্ট্রীয় সফরে আসেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের পর এটিই তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। ওয়াশিংটন ও তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে সহযোগিতার জন্য তিনি ইসলামাবাদকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
অর্থনৈতিক চিত্র ও সীমাবদ্ধতা
পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য প্রশ্ন হলো—এসব থেকে পাকিস্তানের কী লাভ হচ্ছে? বিগত অর্থবছরে পাকিস্তান ৩ দশমিক ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। রেমিট্যান্স ৮ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ৩০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং রাজস্ব ঘাটতি কমেছে। তবে লাহোরভিত্তিক অর্থনীতিবিদ হিনা শেখ (ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত) আল-জাজিরাকে বলেন, ‘পাকিস্তানের এ মধ্যস্থতা হয়তো খুব সীমিত অর্থনৈতিক লাভ বয়ে আনবে। যেমন হরমুজ প্রণালি আবার খুলে গেলে জ্বালানি আমদানি খরচ কমতে পারে এবং ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে নতুন গতি আসতে পারে।’
হিনা শেখ আরও বলেন, সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে নয়; বরং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেল ও গ্যাস আমদানি সাময়িকভাবে কমে যাওয়ার ফল। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের সময় নৌপথটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তান এখনো আইএমএফের ৭০০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির অধীনে রয়েছে, যা ২০২৪ সালে অনুমোদিত ২৫তম ঋণচুক্তি।
আঞ্চলিক পুরস্কার ও জটিলতা
পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের মতে, প্রকৃত লাভ আঞ্চলিক সুবিধায় নিহিত। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে বেলুচিস্তান সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য চালু হতে পারে এবং ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প আলোচনায় ফিরতে পারে। তবে রিয়াদভিত্তিক কিং ফয়সাল সেন্টার ফর ইসলামিক রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজ-এর গবেষক উমর করিম বলেন, পাকিস্তান এমন এক শূন্যস্থান পূরণ করতে সংকটে প্রবেশ করেছিল, যা এখন সংকুচিত হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন অন্য কোনো মধ্যস্থতাকারীকে বিশ্বাস করতে পারছিল না, তাই পাকিস্তান সেই ভূমিকা নেয়। কিন্তু পাকিস্তান এখনো ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে বা যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের দাবি মেনে নিতে রাজি করাতে পারে না। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখাও কঠিন।
সুবিধাভোগী কারা?
বুর্গেনস্টকে জেডি ভ্যান্স বিশেষভাবে ফিল্ড মার্শাল মুনিরের নাম উল্লেখ করেন, যিনি বেসামরিক সরকারের অংশ নন। পর্যবেক্ষকদের মতে, গত চার মাসে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান সুবিধা পেয়েছে। পাকিস্তানের ইতিহাসে ৩০ বছরের বেশি সময় সামরিক বাহিনী দেশ শাসন করেছে এবং এখনো পররাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে বড় প্রভাব রাখে।
ইসলামাবাদভিত্তিক প্রতিরক্ষাবিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার তুঘরাল ইয়ামিন আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা এখন একটি বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। অর্থনৈতিক সুফল বেলুচিস্তানের জনগণের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া গেলেই কেবল সন্ত্রাসবাদের অভিশাপ দূর করা সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, অতীতে আমরা এমন বহু সুযোগ হাত ছাড়া করেছি।



