ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হওয়ার প্রায় চার মাস পেরিয়ে গেছে। এই সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছে। বর্তমানে সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার একটি সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলছে, যার মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার রূপরেখা তৈরি হবে।
জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানসমূহ
যুদ্ধ থেকে জ্বালানি খাত সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ প্রবাহিত হতো। এই জলপথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১২৬ ডলারে পৌঁছেছিল, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির পর তেলের দাম কমে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে এসে বর্তমানে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭২ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।
সৌদি আরামকোর প্রথম প্রান্তিকের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ২৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) প্রথম প্রান্তিকে ৩২০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। শেল ৬৯০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে, আগের বছর ছিল প্রায় ৫৬০ কোটি ডলার। টোটালএনার্জিসের সংশোধিত নিট আয় দাঁড়িয়েছে ৫৪০ কোটি ডলার, আগের বছর ছিল ৪২০ কোটি ডলার।
সামরিক সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বের শীর্ষ অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা হোয়াইট হাউসে জরুরি বৈঠকে বসেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রের মজুত কমে আসায় তারা অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে সম্মত হন। বোয়িংয়ের প্রথম প্রান্তিকে আয় ১৪ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ২২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, লোকসান কমে ৭ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। নর্থরপ গ্রুম্যানের জমা ক্রয়াদেশের পরিমাণ রেকর্ড ৯ হাজার ৫৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের অনুরোধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিরক্ষা খাতে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বাড়তি বাজেট অনুমোদন করেন এবং পরে আরও ২০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল দাবি করেন। 'কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট' ও ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০-২৪ সালে পেন্টাগনের কাছ থেকে বেসরকারি অস্ত্র কোম্পানিগুলো ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের চুক্তি পেয়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশ গেছে পাঁচটি কোম্পানির পকেটে।
পণ্য পরিবহন ও বিমা কোম্পানি
কেপলার চেউভরেক্সের তথ্যানুযায়ী, সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচলের সময় বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের মোট তেলবাহী ট্যাংকার বহরের প্রায় ৭ শতাংশ চলাচল থেকে বাদ পড়েছে। পণ্য পরিবহনের ভাড়া ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফ্রন্টলাইন প্রথম প্রান্তিকে ৫৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি আয় করেছে। ডিএইচটি তাদের কিছু জাহাজের জন্য দৈনিক ১ লাখ ডলারের বেশি ভাড়ার চুক্তি নিশ্চিত করেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের 'যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বিমা'র খরচ পাঁচ গুণ বেড়ে জাহাজের মূল্যের ১.৫ শতাংশে পৌঁছেছে, কিছু ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। গার্ড, স্কাল্ড ও নর্থস্ট্যান্ডার্ডের মতো বিমা কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১.৫ শতাংশ করেছে। ইউনিভার্সিটি অব নর্দান কলোরাডোর অধ্যাপক কনস্ট্যান্টিন গুরদগিভ আল-জাজিরাকে বলেন, 'যত দিন বেসামরিক জাহাজের বড় ক্ষয়ক্ষতি না হচ্ছে, তত দিন যুদ্ধকালীন বিমা কোম্পানিগুলোর স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি মুনাফা বাড়তেই থাকবে।'
ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকগুলো
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ছয় বিনিয়োগ ব্যাংক—জেপি মরগান চেজ, ব্যাংক অব আমেরিকা, সিটিগ্রুপ, মরগান স্ট্যানলি, গোল্ডম্যান স্যাকস ও ওয়েলস ফার্গো—চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে যৌথভাবে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে। জেপি মরগান একাই ১৬.৫ বিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। ব্যাংক অব আমেরিকা মুনাফা করেছে ৮.৬ বিলিয়ন ডলার, আগের বছর ছিল প্রায় ৭.৪ বিলিয়ন ডলার।
প্রেডিকশন মার্কেটের জুয়াড়িরা
অনলাইন প্রেডিকশন মার্কেটে সন্দেহজনক লেনদেনের ঘটনা উঠে এসেছে। ২৩ মার্চ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা স্থগিতের ঘোষণার ১৬ মিনিট আগে তেলের ফিউচার্স মার্কেটে ৫৮ কোটি ডলার চলে আসে, যা সাধারণ সময়ের তুলনায় ৯ গুণ বেশি। পলিমার্কেটে 'ইনসাইডার ট্রেডিং' কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, সন্দেহজনক ২ লাখের বেশি বাজির ৭০ শতাংশ জিতেছে, যা পরিসংখ্যানগতভাবে অসম্ভব। এ থেকে আনুমানিক ১৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার মুনাফা তোলা হয়েছে।



