যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৭ জুন সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ি অবকাশযাপন কেন্দ্রে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে দুপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তারা দুই মাসের জন্য যুদ্ধ বন্ধ রাখতে এবং ভবিষ্যতে স্থায়ী শান্তির জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হন। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায়, যা চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
হরমুজ প্রণালি ও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন
ইরানের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য তাদের অনুমতি নেওয়া আবশ্যক, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি মানতে নারাজ। এই ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ঘটে, যা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যপ্রাচ্য সফরের ঠিক পরে সংঘটিত হয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে তা কয়েক ঘণ্টা বা কয়েকদিনের মধ্যে লঙ্ঘনের নজির আগে ইসরাইলের থাকলেও এবার যুক্তরাষ্ট্র একই পথ অনুসরণ করল।
বিশ্বশান্তি ঝুঁকির মুখে
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বশান্তি চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এই যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, বর্তমান সমঝোতা চুক্তি যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে এবং পুনরায় যুদ্ধ শুরু হলে তা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। প্রতীকী অর্থে এই সমঝোতা চুক্তিকে সার্কাসের দড়ির সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, যার ওপর দিয়ে বিশ্বশান্তি হাঁটছে এবং যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
কাতারে পরোক্ষ আলোচনা, অগ্রগতি নেই
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, বুধবার কাতারে দুপক্ষের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ হয়েছে কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই। ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চায় এবং লেবাননে ইসরাইলের হামলা বন্ধের দাবি জানায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ পুরোপুরি উন্মুক্ত করতে চায়। এই মতপার্থক্য এখনো বিশাল। ফলে বিশ্বশান্তি এখন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপ নতুন করে সংঘাতের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে। সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরান বিদেশে তাদের জব্দ সম্পদ উন্মুক্ত করার ওপরও জোর দিচ্ছে।
লেবানন ও হিজবুল্লাহ ইস্যু
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে লেবাননে ইসরাইল এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতের অবসানের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইসরাইল ও লেবানন সরকারের মধ্যে পৃথক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিয়ে আসছে, যার ফলে একটি কাঠামোগত নিরাপত্তা চুক্তি হয়েছে। তবে হিজবুল্লাহ এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই নিরাপত্তা চুক্তি লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলের দখল আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।
ইসরাইলের তৃতীয় হামলার হুমকি
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কার্টজ বলেছেন, প্রয়োজন মনে করলে ইরানে আবারও হামলা চালাতে পারে ইসরাইল। তিনি বলেন, 'আমরা ইরানে দুবার সক্রিয় ও আগাম প্রতিরোধমূলক হামলা চালিয়েছি। প্রয়োজন হলে তৃতীয়বারও হামলা চালাব।' ইসরাইলি বাহিনী লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় কথিত নিরাপত্তা অঞ্চলে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবস্থান করবে বলেও জানান তিনি।
বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোহরেহ খারাজমি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী দফার আলোচনা কতটা এগোবে, তা এখন মূলত ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করছে। সমঝোতা স্মারকের ধারাগুলো বাস্তবায়ন করা হলে তবেই পরবর্তী ধাপে এগোনোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে।'



