প্রতিশ্রুতিহীন অংশীদারত্ব
চীন ও ইরানের ২৫ বছর মেয়াদি 'ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্ব' চুক্তিতে জ্বালানি, অবকাঠামো ও সামরিক সহযোগিতার কথা থাকলেও অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে কোনো 'পারস্পরিক প্রতিরক্ষা'র ধারা রাখা হয়নি। বেইজিং পাকিস্তানের সঙ্গে যে ধরনের অটুট প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ, ইরানের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের ফারজিন নাদিমির মতে, এই চুক্তি কোনো প্রতিরক্ষা গ্যারান্টি দেয় না। সহজ কথায়, বেইজিংয়ের কাছে তেহরান মূলত দ্বিতীয় সারির অংশীদার, যেখানে প্রথম সারিতে রয়েছে ইসলামাবাদ।
২০২৬ সালের সংঘাতে চীনের ভূমিকা
২০২৬ সালের সংঘাতের সময় এই অসমতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর গভীর সংকট তৈরি হলেও বেইজিং কোনো সামরিক সহায়তা পাঠায়নি। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এই হত্যাকাণ্ডকে 'একটি অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ' বলে মন্তব্য করেন, যা শিকাগো কাউন্সিলের গবেষকদের মতে ছিল চরম নিরপেক্ষ ও দায় এড়ানোর কৌশল। জাতিসংঘে রাশিয়ার সঙ্গে জরুরি অধিবেশন ডাকা কিংবা তেহরানবিরোধী প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকা—সব মিলিয়ে বেইজিংয়ের ভূমিকা সামরিক সহায়তার বদলে কেবলই কূটনৈতিক সমবেদনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
সাইডলাইনে বসে মুনাফা অর্জন
বেইজিংয়ের এই নিরপেক্ষতা কেবল সতর্কতাই ছিল না, ছিল অত্যন্ত লাভজনক। গত দুই বছরে চীন গোপনে প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেলের এক ঐতিহাসিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ গড়ে তুলেছে, যা দিয়ে ১০৯ দিনের আমদানি চাহিদা মেটানো সম্ভব। এই বিপুল মজুত মূলত গড়ে উঠেছে নিষেধাজ্ঞাকবলিত ইরান, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলা থেকে ব্রেন্ট ক্রুডের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৫ থেকে ১৫ ডলার কমে কেনা সস্তা খনিজ তেল দিয়ে। চলতি সংঘাতের সময়ে ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই গেছে চীনে। এটিই মূলত এই সম্পর্কের মূল রসায়ন: বেইজিং চড়া ছাড়ে তেহরানের তেল কিনে মুনাফা লুটবে, কিন্তু সহযোদ্ধা হিসেবে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর যেকোনো আমন্ত্রণ স্রেফ প্রত্যাখ্যান করবে।
চীন তেহরানের পতন চায় না
তবে ইরানের ভাগ্য নিয়ে যে চীনের কোনো মাথাব্যথা নেই, তা কিন্তু নয়। প্রথমত, বেইজিংয়ের অন্যতম স্বপ্নের প্রকল্প 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (বিআরআই)-এর 'সেন্ট্রাল বেল্ট' করিডরের প্রধান ভূকৌশলগত সংযোগস্থলে রয়েছে ইরান। এর মাধ্যমে চীনা পণ্য ও পুঁজি মধ্য এশিয়া হয়ে পারস্য উপসাগর ও ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর কথা। ইরানের নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমা শিবিরের হাতে চলে গেলে এই করিডর পাকিস্তান সীমান্তেই থমকে যাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো স্থলপথে চীনের জন্য অগম্য হয়ে পড়বে। সি চিন পিং তাঁর এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের এমন পরিণতি কখনোই মেনে নেবেন না।
আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য
দ্বিতীয় কারণটি হলো আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে চীন ও রাশিয়ার যৌথ দৃষ্টিভঙ্গি। সংকটজুড়ে মস্কো ও বেইজিং নিবিড়ভাবে তেহরানকে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে গেছে, যদিও কোনো সরাসরি সামরিক সাহায্য পাঠায়নি। সেন্ট পিটার্সবার্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পুতিনের দেওয়া মৌখিক আশ্বাস মূলত কথার স্তোকবাক্য হলেও এর মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—মস্কো ও বেইজিং কেউই ইরানের পতন দেখতে চায় না, যদিও কেউই তার সুরক্ষায় সামরিক গ্যারান্টি দিতে প্রস্তুত নয়।
পাকিস্তান ফ্যাক্টর
বেইজিংয়ের এই হিসাব বুঝতে হলে পাকিস্তানের দিকে তাকাতে হবে, যাকে চীন দ্ব্যর্থহীন সামরিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে। ২০২০-২৪ সালের মধ্যে চীনের মোট অস্ত্র রপ্তানির ৬০ শতাংশের বেশি গেছে পাকিস্তানে। এর বড় প্রমাণ মেলে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের তীব্র আকাশযুদ্ধে। তবে ভারতের তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা রাহুল সিংয়ের মতে, বেইজিং মূলত পাকিস্তানকে 'অস্ত্র পরীক্ষার জীবন্ত ল্যাবরেটরি' হিসেবে ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন 'ঘেরাও নীতি' ও মার্কিন-জাপান-অস্ট্রেলিয়া-ভারতের চতুর্মুখী জোট মোকাবিলায় এই মিত্রতা বেইজিংয়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ভারতের সীমান্তে একজন নির্ভরযোগ্য অংশীদার চীনের বড্ড প্রয়োজন হওয়ায়, কাশ্মীরে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধে জড়ানো পাকিস্তানই বেইজিংয়ের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও কৌশলগত মিত্র।
একই কৌশলের এপিঠ–ওপিঠ
চীনের ইরান ও পাকিস্তাননীতি মূলত একই কৌশলগত সমীকরণের অংশ। বেইজিং ভোলেনি যে শাহ আমলে পশ্চিমাপন্থী ইরান ও বৈরী ভারত যৌথভাবে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করে ফেলেছিল। ইরান যদি আবার পশ্চিমা শিবিরে যোগ দেয়, তবে পাকিস্তান আবারও দুই দিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। শত শত কোটি ডলার খরচ করে পাকিস্তানকে যারা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলেছে, বেইজিংয়ের জন্য সেই পুরোনো ভূরাজনীতির পুনরাবৃত্তি হবে একটি বড় দুঃস্বপ্ন। তাই তেহরানকে পশ্চিমাবিরোধী শিবিরে টিকিয়ে রাখা কোনো আবেগের বিষয় নয়; এটি মূলত চীন-পাকিস্তান অক্ষের সুরক্ষার জন্য একধরনের কৌশলগত বিমা।
অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্যের সমীকরণ
চীন ইতিমধ্যেই ইরানকে তাদের 'বেইডু' স্যাটেলাইট সুবিধা, রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছে। হাডসন ইনস্টিটিউটের কান কাসাপোওগ্লুর মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইরানের সম্ভাব্য অস্ত্র তালিকায় জে-১০সি ফাইটার, এইচকিউ-৯ বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র পুনর্গঠনের যন্ত্রাংশ রয়েছে। রাশিয়া অর্থ নিয়েও সু-৩৫ বিমান দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ইরান এখন বেইজিংয়ের কাছে জরুরি ভিত্তিতে জে-১০সি চাচ্ছে, যার পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ভারতের রাফালের মেটিওর ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বেশি। তা সত্ত্বেও, চীনা সামরিক বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন যে বিস্তৃত সেন্সর ও যুদ্ধ-ব্যবস্থাপনা নেটওয়ার্ক ছাড়া ইসরায়েলের এফ-৩৫আই বহরের সামনে এই বিমানগুলো স্রেফ 'সহজ লক্ষ্যবস্তু' হয়ে থাকবে। এটি মূলত একটি রিমাইন্ডার যে বেইজিং যেকোনো অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইসরায়েল এবং সর্বোপরি ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করার ঝুঁকি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মেপে দেখে।
দীর্ঘমেয়াদি হিসাব–নিকাশ
চীনের ইরান–কৌশল কোনো চিরস্থায়ী মিত্রতা নয়, বরং তেল আর ক্ষেপণাস্ত্রের মাপে নির্ধারিত এক নিখুঁত হিসাব-নিকাশ। বেইজিং চড়া ছাড়ে তেল কিনবে, গোয়েন্দা তথ্য ও স্যাটেলাইট সুবিধা ভাগাভাগি করবে, কিন্তু তেহরানের জন্য নিজেরা কোনো যুদ্ধে জড়াবে না বা ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলবে না। তবে চীন কোনোভাবেই ইরানের পতন বা পশ্চিমা শিবিরে অন্তর্ভুক্তি মেনে নেবে না। কারণ, তা হলে পাকিস্তান সীমান্তে তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প ভেস্তে যাবে এবং তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র পাকিস্তান কৌশলগতভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। ক্ষণস্থায়ী আবেগের বদলে চীন এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি চাল খেলছে এবং অন্যের পাতানো ফাঁদে পা না দেওয়ার কারণেই বেইজিং এখন পর্যন্ত এই খেলায় জয়ী হচ্ছে।
জসিম আল-আজাবি সাংবাদিক। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত।



