ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৯.৪% কমেছে
ইউরোপে পোশাক রপ্তানি ১৯.৪% কমেছে বাংলাদেশের

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। আর সেই পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় একক বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম ৪ মাসের পরিসংখ্যান বাংলাদেশের জন্য সুখকর কোনও বার্তা দিচ্ছে না। বরং তথ্য বলছে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্যে বড় পতন

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাট-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। শুধু রফতানি আয় কমেনি, একই সঙ্গে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্বও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রধান পোশাক রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজার অংশীদারত্ব হারিয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও চাহিদা সংকটের কারণে প্রায় সব দেশই কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের রফতানি পতনের হার প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এটি শুধু বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব নয়, বরং দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১.৪৭ বিলিয়ন ইউরোর ধাক্কা

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে বাংলাদেশ ইইউভুক্ত দেশগুলোতে ৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ইউরোর তৈরি পোশাক রফতানি করেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই রফতানির পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রফতানি আয় কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ইউরো, যা শতাংশের হিসাবে ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এদিকে একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি কমেছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাজার সংকুচিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের রফতানি কমেছে বাজার সংকোচনের প্রায় দ্বিগুণ হারে। এ কারণেই বাংলাদেশের বাজার অংশীদারত্বও কমে গেছে। ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৯ শতাংশে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ প্রায় আড়াই শতাংশ পয়েন্ট বাজার হারিয়েছে, যা প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন।

চীনের সঙ্গে ব্যবধান বাড়ছে

দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে দেশটি। জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে চীনের পোশাক রফতানি মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। ৮ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ইউরো থেকে তা কমে ৭ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। ইইউর মোট আমদানি যেখানে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে, সেখানে চীনের পতন তার অর্ধেকেরও কম। ফলে দেশটির বাজার অংশীদারিত্ব ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ইউরোপের বাজার ছোট হলেও সেই বাজারের বড় অংশ নিজেদের দখলে নিতে পেরেছে চীন। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ব্যবধান আরও বেড়েছে।

নিটওয়্যার ও ওভেন—দুই খাতেই সংকট

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মূলত দুটি বড় খাতের ওপর নির্ভরশীল—নিটওয়্যার ও ওভেন গার্মেন্টস। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দুটি খাতই বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। নিটওয়্যার রফতানি কমেছে ২০ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৫ সালের ৪ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ইউরো থেকে তা নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ইউরোতে। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রফতানি কমেছে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। ৩ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ইউরো থেকে কমে হয়েছে ২ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরো। এতে বোঝা যায়, কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের কারণে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পই ইউরোপের বাজারে চাপের মধ্যে রয়েছে।

মাসভিত্তিক চিত্র উদ্বেগজনক

ইউরোস্ট্যাটের মাসভিত্তিক তথ্য আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। বছরের শুরুতেই জানুয়ারিতে রফতানি কমেছে ২৫ শতাংশেরও বেশি। ফেব্রুয়ারিতে পতনের হার কিছুটা কমে ১২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এলেও মার্চ ও এপ্রিলে আবার পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। মার্চে রফতানি কমেছে ১৯ দশমিক ২ শতাংশ এবং এপ্রিলে ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ। সাধারণত বছরের প্রথম ভাগে ইউরোপের খুচরা বিক্রেতারা বসন্ত ও গ্রীষ্মকালীন মৌসুমের জন্য অর্ডার দিয়ে থাকে। কিন্তু সেই সময়েও বাংলাদেশ পর্যাপ্ত অর্ডার আকর্ষণ করতে পারেনি। এর অর্থ হচ্ছে, শুধু সাময়িক চাহিদা সংকট নয়, বরং সোর্সিং সিদ্ধান্তে ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকেও ঝুঁকছেন।

পোশাকের দামও কমেছে

রফতানি কমার পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ইউনিট মূল্য বা গড় রফতানি মূল্য কমে যাওয়া। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে বাংলাদেশের রফতানি আয় কমেছে ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে রফতানি পরিমাণ কমেছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশ শুধু কম পরিমাণ পণ্য বিক্রি করেনি, বরং আগের তুলনায় কম দামেও বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। মার্চ ২০২৫ ও মার্চ ২০২৬-এর তুলনায় দেখা যায়, রফতানি মূল্যের পতন ১৯ দশমিক ২৪ শতাংশ হলেও রফতানি পরিমাণ কমেছে মাত্র ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। বিপরীতে ইউনিট মূল্য কমেছে ১৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এটি প্রমাণ করে যে বাজার ধরে রাখতে রফতানিকারকদের অনেক ক্ষেত্রে মূল্যছাড় দিতে হয়েছে।

কেন কমছে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক কারণের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সমস্যাও রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার, যুদ্ধ পরিস্থিতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বন্দরের অদক্ষতা রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিল্প মালিকদের অভিযোগ, দেশে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব এবং বন্দর ব্যবস্থাপনায় জটিলতা অনেক কারখানার সময়মতো পণ্য সরবরাহ সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা আগের মতো শক্তিশালী থাকছে না।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি কমার পেছনে শুধু অর্ডার হ্রাস নয়, ইউনিট মূল্য কমে যাওয়াও বড় কারণ। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, রফতানির পরিমাণের পাশাপাশি পোশাকের গড় দামও কমেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের বাড়তি মূল্যচাপের ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল থাকলেও বাংলাদেশকে এখন প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। উৎপাদন ব্যয় কমানো, বন্দর ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যের ও মূল্যসংযোজনকারী পণ্যের দিকে ঝুঁকতে পারলে হারানো বাজার পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে এটি শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ভিয়েতনাম এগিয়ে যাচ্ছে

যখন বাংলাদেশ বড় ধরনের পতনের মুখে, তখন ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রেখেছে। ৪ মাসে দেশটির রফতানি কমেছে মাত্র ০ দশমিক ৭ শতাংশ। বরং নিটওয়্যার রফতানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে ইউরোপের বাজারে ভিয়েতনামের অংশীদারত্ব ৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ইভিএফটিএ), পণ্যের বৈচিত্র্য, উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য উৎপাদন এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ভিয়েতনামকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।

পাকিস্তান, তুরস্ক ও ভারতের চিত্র

পাকিস্তানের রফতানি ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে নিটওয়্যার খাতে দেশটির পতন ২২ দশমিক ১ শতাংশ। তুরস্কের রফতানি কমেছে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। ইউরোপের কাছাকাছি অবস্থান ও দ্রুত ডেলিভারির সুবিধা থাকা সত্ত্বেও দেশটি বাজার ধরে রাখতে পারেনি। ভারতের রফতানি কমেছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ, যা ইইউর সামগ্রিক আমদানি হ্রাসের কাছাকাছি। ফলে ভারত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

এলডিসি উত্তরণের আগে সতর্ক সংকেত

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। ২০২৯ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে বর্তমানে পাওয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা আর থাকবে না। তখন প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। যদি এখনই উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন, বন্দর সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং উচ্চমূল্যের পণ্যে বৈচিত্র্য আনা না যায়, তাহলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

সামনে কী অপেক্ষা করছে

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিশ্ববাজারে চাহিদা কমেছে ঠিকই, কিন্তু সব দেশ সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কেউ কেউ বাজার হারিয়েছে, আবার কেউ সংকটের মধ্যেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রফতানি কমার পাশাপাশি বাজার অংশীদারত্ব এবং ইউনিট মূল্য—দুটিই কমেছে। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু বৈশ্বিক মন্দা নয়, বরং প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির এই বড় পতন তাই শুধু কয়েক মাসের বাণিজ্য পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। এখন প্রশ্ন হলো, বৈশ্বিক মন্দা কাটলে বাংলাদেশ কি আবার হারানো বাজার ফিরে পাবে, নাকি প্রতিযোগীরা সেই জায়গা স্থায়ীভাবে দখল করে নেবে—তার উত্তর নির্ভর করবে আজকের নীতি ও প্রস্তুতির ওপর।