ইরান যুদ্ধে তেল সরবরাহে বড় ধাক্কা: ৫০০ কোটি ব্যারেল ঘাটতি, ক্ষতি ৫ হাজার কোটি ডলার
ইরান যুদ্ধে তেল সরবরাহে বড় ধাক্কা, ক্ষতি ৫ হাজার কোটি ডলার

ইরান যুদ্ধে তেল সরবরাহে বড় ধাক্কা: ৫০০ কোটি ব্যারেল ঘাটতি, ক্ষতি ৫ হাজার কোটি ডলার

ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রায় ৫০ দিন পেরিয়ে গেছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকটের কারণে তেলের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে, এবং যে পরিমাণ তেল কম উৎপাদিত হয়েছে, তার আর্থিক মূল্য বিপুল। বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন ও রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ে অপরিশোধিত তেল উৎপাদনে যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে, তার মূল্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি ডলার। স্বাভাবিকভাবেই আশঙ্কা করা হচ্ছে, এর প্রভাব আগামী কয়েক মাস বা এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত অনুভূত হবে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গভীর চিহ্ন রেখে যেতে পারে।

যুদ্ধের প্রভাব: সরবরাহে বড় ঘাটতি

আন্তর্জাতিক পরিসরে তথ্য ও বিশ্লেষণভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংকট শুরুর পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট সরবরাহ কমেছে ৫০ কোটি ব্যারেলের বেশি। এই বাস্তবতায় বলা হচ্ছে, আধুনিক ইতিহাসে জ্বালানি বাজারে এত বড় বিঘ্ন আর কখনো ঘটেনি। অন্যভাবে বললে, বাজার থেকে হারিয়ে যাওয়া এই ৫০ কোটি ব্যারেল তেলের অর্থ হলো:

  • বৈশ্বিক বিমান চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির চাহিদা ১০ সপ্তাহ বন্ধ থাকা;
  • সারা বিশ্বে ১১ দিন সব ধরনের সড়কযান চলাচল বন্ধ থাকা;
  • পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পাঁচ দিন কোনো ধরনের তেল না থাকা।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির প্রধান বিশ্লেষক আয়ান মাওয়াট এই হিসাব প্রস্তুত করেছেন, যা যুদ্ধের ব্যাপক প্রভাবকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থনৈতিক মূল্য: বিশাল ক্ষতি

রয়টার্সের হিসাব হলো, এই তেল যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক মাস আর পুরো ইউরোপের এক মাসের বেশি সময়ের চাহিদার সমপরিমাণ। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রায় ছয় বছরের জ্বালানি ব্যবহারের সমপরিমাণ (২০২১ অর্থবছরে বছরে প্রায় আট কোটি ব্যারেল ব্যবহারের ভিত্তিতে)। এ ছাড়া এই পরিমাণ তেল দিয়ে প্রায় চার মাস আন্তর্জাতিক পরিসরে জাহাজ চলতে পারত। বাস্তবতা হলো, মার্চ মাসে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দৈনিক প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল কমেছে, যা পরিমাণগত দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম বড় দুই তেল কোম্পানি এক্সনমোবিল ও শেভরনের সম্মিলিত উৎপাদনের কাছাকাছি।

কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানের জেট জ্বালানি রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯৬ লাখ ব্যারেল। কিন্তু মার্চ ও এপ্রিলের এখন পর্যন্ত মিলিয়ে তা মাত্র ৪১ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। রয়টার্সের হিসাবে, এই ঘাটতির সমপরিমাণ তেল দিয়ে নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দর ও লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার যাওয়া–আসা ফ্লাইট চালানো যেত।

যুদ্ধ শুরুর পরপর তেলের গড় দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ ডলারে উঠেছে। সেই হিসাবে দেখা যায়, যে পরিমাণ সরবরাহ কমেছে, তার আর্থিক মূল্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি ডলার—কেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক জোহানেস রাউবালের ভাষ্য। এই পরিমাণ জার্মানির বার্ষিক জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমান, অথবা লাটভিয়া কিংবা এস্তোনিয়ার মতো ছোট দেশের পুরো অর্থনীতির সমপরিমাণ, যা যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের ব্যাপকতাকে তুলে ধরে।

পুনরুদ্ধারে সময় লাগবে

এদিকে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকলেও উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসেই বৈশ্বিক স্থলভিত্তিক অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল কমেছে। মার্চের শেষ দিক থেকে উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটায় এই মজুতের পরিমাণ দৈনিক প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে।

বাস্তবতা হলো, কুয়েত ও ইরাকের যেসব তেলক্ষেত্রে ভারী তেল উৎপাদিত হয়, সেই তেলক্ষেত্রগুলো স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে চার থেকে পাঁচ মাস সময় নিতে পারে। এর ফলে পুরো গ্রীষ্মকালে মজুত কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন রাউবাল। এদিকে পরিশোধন সক্ষমতার ক্ষতি এবং কাতারের রাস লাফান এলএনজি কমপ্লেক্সে হামলার কারণে এই অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো পুরোপুরি পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদী সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গতকাল শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ইসরায়েল–লেবাননের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ‘শিগগিরই’ চুক্তি হতে পারে, যদিও সময়সীমা এখনো অনিশ্চিত। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে, এবং অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা জরুরি হয়ে উঠেছে।