এলডিসি উত্তরণ পিছানোর আবেদন: জাতিসংঘের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সময় লাগবে
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের আবেদন নিয়ে জাতিসংঘ এখনই চূড়ান্ত 'হ্যাঁ' বা 'না' জানাবে না। এই প্রক্রিয়ায় কিছু সময় লাগবে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মন্তব্য করেছেন যে, বাংলাদেশ 'ক্রাইসিস বাটনে' চাপ দিয়েছে বলে মনে হয়।
জাতিসংঘের বৈঠক ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া
আগামী সোমবার থেকে নিউইয়র্কে পাঁচ দিনব্যাপী জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকে বাংলাদেশের আবেদন কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা ঠিক করা হবে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, যিনি সিডিপির এনহ্যান্স মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম) উপকমিটির প্রধান ও সদস্য, আজ শনিবার রাতে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন এই বৈঠকে অংশ নিতে। চলতি সপ্তাহে ইএমএম উপকমিটিরও বৈঠক হবে, যেখানে ইতিমধ্যে উত্তরণ সম্পন্ন করেছে এবং পাইপলাইনে থাকা দেশগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে।
পাইপলাইনে থাকা তিনটি দেশ হলো বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওস। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নতুন বিষয় হলো, উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে, এই চিঠি সরকারপ্রধান নয়, বরং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য উল্লেখ করেছেন যে, নতুন সরকারের অভ্যন্তরীণ আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
মূল্যায়নের কাঠামো ও 'ক্রাইসিস বাটন'
প্রথাগত কাঠামো অনুযায়ী, বাংলাদেশকে আগের উত্তরণ মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সঙ্গে সবচেয়ে সাম্প্রতিক তথ্য মিলিয়ে বিচার করা হবে। বিশেষ করে, গত নভেম্বর মাসে সরকারের দেওয়া প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে নতুন আবেদনের তুলনা হবে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, 'যে সচিব এখন উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছেন, তিনিই গত নভেম্বর মাসে বলেছিলেন, সবকিছু ঠিক আছে।'
এছাড়াও, উত্তরণকালীন কৌশলপত্র বাস্তবায়নে বাংলাদেশ কতটা আন্তরিক ছিল, তা বিবেচনার বিষয় হবে। উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পর্ষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে উত্তরণ পেছানোর আবেদন করা হবে না, কিন্তু নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই আবেদন করে দিয়েছে। নেপাল ও লাওসের ক্ষেত্রে নতুন কোনো আবেদন নেই, তাই বাংলাদেশের আবেদন মূল্যায়নের সময় এই দুই দেশের অভিজ্ঞতাও পর্যালোচনা করা হবে।
ইএমএম কাঠামোর মধ্যে 'ক্রাইসিস বাটন' নামে একটি ব্যবস্থা রয়েছে, যা ব্যবহার করা হয় যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বা অভাবিত কিছু ঘটে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, এই চিঠি দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ এই ক্রাইসিস বাটন চেপে দিয়েছে। শেষবার এই সুযোগ ব্যবহার করেছিল সলোমন আইল্যান্ডস, যারা সুনামির অভিঘাতসহ নানা সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, এবং তাদের দুই-তিন বছর সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশের আবেদন ও প্রস্তুতি
সরকারের পক্ষে ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী গত বুধবার জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন সিডিপি চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে একটি চিঠি পাঠান। এতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে এলডিসি উত্তরণ-প্রস্তুতির সময় ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ হবে চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর, এবং চূড়ান্ত উত্তরণের আগে তৃতীয় পর্যালোচনা প্রক্রিয়া চলমান।
ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে, মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় কোনো দেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্য কি না। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণতা সূচক (ইভিআই)। ২০২১ সালেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল যে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে, কিন্তু করোনার কারণে উত্তরণ দুই বছর পিছিয়েছে।
