যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি: বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় মালয়েশিয়ার তুলনায় কঠোর শর্ত
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: মালয়েশিয়ার তুলনায় একতরফা শর্ত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি: বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় মালয়েশিয়ার তুলনায় কঠোর শর্ত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তবে অভিযোগ উঠেছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, বাজার উন্মোচন এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত ধারাগুলো অত্যন্ত কঠোর। অন্য অনেক দেশের সঙ্গে চুক্তির শর্তগুলো ততটা কঠোর নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার চুক্তির তুলনামূলক বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির ওয়েবসাইটে এখন পর্যন্ত সাতটি দেশের চুক্তির কপি পাওয়া যাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ ও তাইওয়ান উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের চুক্তির সঙ্গে মালয়েশিয়ার চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোর তুলনা করলে স্পষ্ট হয় যে বাংলাদেশের স্বার্থ কম রক্ষিত হয়েছে।

করসুবিধা-বিষয়ক অভিযোগ

বাংলাদেশের চুক্তিতে উল্লেখ আছে, যুক্তরাষ্ট্র তার রপ্তানির ওপর কর ছাড় দিলে বা কর না নিলে বাংলাদেশ তার বিরুদ্ধে কোনো পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় অভিযোগ করবে না। অন্যদিকে, মালয়েশিয়ার চুক্তিতে উভয় দেশই ডব্লিউটিওতে অভিযোগ না করার শর্ত রয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি একতরফা বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি ও শুল্ক

বাংলাদেশ যদি অন্য দেশের সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্যচুক্তি করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে উচ্চশুল্ক আরোপ করতে পারবে। মালয়েশিয়া শুধু আলোচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ফলে তাদের পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা বেশি। এছাড়া, বাংলাদেশ ডিজিটাল কনটেন্টে কোনো শুল্ক আরোপ না করার অঙ্গীকার করেছে, কিন্তু মালয়েশিয়া ভবিষ্যতে রাজস্ব সংগ্রহের সুযোগ রেখে দিয়েছে।

বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও তৃতীয় দেশের কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ

যুক্তরাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার কারণে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেয়, বাংলাদেশকে তার সঙ্গে মিল রেখে একই ব্যবস্থা নিতে হবে। মালয়েশিয়া এ ক্ষেত্রে আলোচনার সুযোগ রেখেছে এবং যৌথ উদ্বেগ মোকাবিলার শর্ত যুক্ত করেছে। তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কম দামে পণ্য রপ্তানি করলে তা ঠেকানোর দায়িত্ব বাংলাদেশের, কিন্তু মালয়েশিয়া নিজস্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।

বিনিয়োগ সুবিধা ও ভর্তুকিসংক্রান্ত তথ্য

বাংলাদেশকে জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সমান সুযোগ দিতে হবে। মালয়েশিয়া নিজস্ব আইন অনুযায়ী সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভর্তুকির তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সব ধরনের ভর্তুকির বিবরণ যুক্তরাষ্ট্র ও ডব্লিউটিওকে দিতে হবে, কিন্তু মালয়েশিয়া শুধু গোপনীয় নয় এমন তথ্য দেবে।

কৃষিপ্রযুক্তিপণ্য ও সার্বিক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশকে চুক্তি স্বাক্ষরের ২৪ মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ বলে স্বীকৃত জৈবপ্রযুক্তিপণ্য বিনা পরীক্ষায় আমদানির নীতিমালা তৈরি করতে হবে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মালয়েশিয়া দেশের আইন অনুযায়ী সহযোগিতার কথা বলে এই বাধ্যবাধকতা এড়িয়েছে। সার্বিকভাবে, মালয়েশিয়া দরকষাকষির মাধ্যমে উভয় পক্ষের জন্য প্রযোজ্য শর্ত রেখেছে, কিন্তু বাংলাদেশের চুক্তিতে একতরফা বাধ্যবাধকতা বিদ্যমান।

বাংলাদেশের করণীয় ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ

মালয়েশিয়ার চুক্তির সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় এই চুক্তিতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি, কারণ নির্বাচনের তিন দিন আগে স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিএনপি সরকারের উচিত জাতীয় স্বার্থে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন ও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া।