সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপ, বৈশ্বিক বাণিজ্যে ধাক্কা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তাঁর আগের শুল্ক ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর দ্রুতই নতুন পদক্ষেপ নিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার রাতে তিনি একটি নির্বাহী আদেশে সই করে সারা বিশ্ব থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। এই ঘোষণা বৈশ্বিক বাণিজ্য জগতে নতুন করে অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে।
১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের 'সেকশন ১২২' ব্যবহার
ট্রাম্প এবার ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের 'সেকশন ১২২' ব্যবহার করে নতুন শুল্ক আরোপ করেছেন। এই আইন অনুযায়ী, দেশের বাণিজ্যঘাটতি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট সাময়িকভাবে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারেন। আগামী মঙ্গলবার থেকে ১৫০ দিনের জন্য এই শুল্ক কার্যকর হবে। ট্রাম্পের নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের ওপর প্রযোজ্য হবে।
মেক্সিকো ও কানাডার জন্য ব্যতিক্রম
তবে মেক্সিকো ও কানাডা থেকে আসা যেসব পণ্য উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) শর্ত মেনে চলে, সেগুলো এই শুল্কের আওতামুক্ত থাকবে। এ ছাড়া ওষুধশিল্প, অ্যারোস্পেস পণ্য, যাত্রীবাহী গাড়ি, হালকা ট্রাক এবং নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও কৃষিপণ্য এই তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের রায় ও আগের শুল্ক বাতিল
এর আগে ট্রাম্প ১৯৭৭ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) ব্যবহার করে শুল্ক আরোপ করেছিলেন। তবে গতকাল দেশটির সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, এই আইন প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না। এ কারণে ওই শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেওয়া হয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, আদালতের রায়ে আগের শুল্কব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও নতুন কৌশলে ট্রাম্প তাঁর বাণিজ্যযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করেছেন।
শুল্ক বাবদ আদায়কৃত অর্থ নিয়ে প্রশ্ন
সুপ্রিম কোর্ট আগের শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করায় এখন আমদানিকারকদের থেকে শুল্ক বাবদ আদায় করা শত শত কোটি ডলার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই রায়ের ফলে প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ফেরত দিতে হতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসাম এই অর্থকে 'অবৈধ অর্থ ছিনতাই' উল্লেখ করে তা অবিলম্বে সুদে-আসলে ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে ট্রাম্প বলেছেন, এই অর্থ ফেরত দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে বছরের পর বছর মামলা চলবে।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য
ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। কানাডীয় চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট ক্যান্ডাস লেং বলেন, 'কানাডার উচিত আরও কঠোর বাণিজ্যিক চাপের জন্য প্রস্তুত থাকা।' ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটেনও নতুন পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, আদালতের রায়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব খাতে খুব একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তাঁর মতে, আগের শুল্ক বাতিল হওয়ায় যে ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল, নতুন শুল্ক আরোপের ফলে তা লাঘব হবে।
ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ও ট্রাম্পের কৌশল
ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো আদালতের রায়কে স্বাগত জানালেও ট্রাম্পের পাল্টা পদক্ষেপে তারা এখন নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে শুল্ক ব্যবহার করছেন। গত বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতার নজিরবিহীন ব্যবহার করছেন এবং শুল্ক আরোপ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব
ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপ বিশ্ববাণিজ্যের জন্য বিরাট এক ধাক্কা হয়ে আসে। ওই শুল্ক ঘোষণার সময় ট্রাম্প দিনটিকে আমেরিকার 'স্বাধীনতা দিবস' (অর্থনৈতিক) বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জন্য তা বড় দুঃসংবাদ হয়ে আসে। এই নতুন শুল্ক ব্যবস্থা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
