যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়: ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নীতি আইন বহির্ভূত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন একটি বড় ধাক্কা খেয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করার ক্ষেত্রে নিজের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। শুক্রবার দেওয়া এই রায়ের ফলে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ট্রাম্প শুল্ককে যেভাবে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছিলেন, তা কার্যত আটকে গেছে।
রায়ের বিস্তারিত ও বিচারপতিদের অবস্থান
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের মধ্যে ছয়জন এই রায়ের পক্ষে মত দিয়েছেন, যেখানে মাত্র তিনজন বিপক্ষে অর্থাৎ ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রক্রিয়া সমর্থন করেছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি সমর্থিত কনজারভেটিভ বিচারপতিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও, তিনজন কনজারভেটিভ বিচারপতি রায়ের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তাঁরা উদারপন্থী তিন বিচারপতির সঙ্গে যোগ দেন, যা আদালতের অভ্যন্তরীণ গতিশীলতায় একটি উল্লেখযোগ্য মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনোমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না। ট্রাম্প এই আইন ব্যবহার করেই বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা তিনি আমেরিকার ‘স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে অভিহিত করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মুক্তির দাবি করেছিলেন।
রায়ের প্রভাব ও অর্থনৈতিক পরিণতি
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত ওই শুল্ক আরোপকে আইন বহির্ভূত বললেও, এর আওতায় এখন পর্যন্ত যে ১৩০ বিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্র আদায় করেছে, তার ভবিষ্যৎ কী হবে সে বিষয়ে আদালত কোনো মন্তব্য করেনি। তবে অর্থনীতিবিদরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে এই সিদ্ধান্তের ফলে গড় শুল্ক হার ১৬.৮ শতাংশ থেকে ৯.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যদিও এটি সাময়িক সময়ের জন্য হতে পারে কারণ মার্কিন সরকার নতুন করে ব্যাপকহারে শুল্ক আরোপের জন্য অন্য পথ খুঁজতে পারে।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন বিভিন্ন দেশের ওপর চাপ প্রয়োগ এবং আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে শুল্ককে ব্যবহার করে আসছেন। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে, গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর, তিনি জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা নজিরবিহীনভাবে ব্যবহার করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যার মধ্যে ‘পাল্টা শুল্ক’ এবং মেক্সিকো, কানাডা ও চীনের ওপর আলাদা শুল্ক অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
আদালতের এই রায় নিয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াই–পার্থেননের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রগরি ডাকো মন্তব্য করেছেন যে এই সিদ্ধান্ত বিশ্ব বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল এমন পরিস্থিতিকে প্রশমিত করতে পারে। অন্যদিকে, শুল্ক নীতিবিষয়ক অলাভজনক সংস্থা ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের এরিকা ইয়র্ক বলেছেন, এই রায় ‘প্রেসিডেন্টের খেয়ালখুশি মতো সর্বব্যাপী শুল্ক আরোপের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সীমিত করবে’। তবুও তিনি সতর্ক করেছেন যে প্রেসিডেন্টের কাছে শুল্ক আরোপের জন্য অন্যান্য আইনি বিধান ব্যবহার করার সুযোগ রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে নতুন বাণিজ্য সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
রায়ের বিপক্ষে ছিলেন রক্ষণশীল বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানফ, ক্ল্যারেন্স থমাস ও স্যামুয়েল আলিটো। তাঁদের এই অবস্থান ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি সমর্থনের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল থাকায় ট্রাম্পের অর্থনৈতিক কৌশলে একটি বড় বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
