বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী গত বুধবার জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে একটি চিঠি পাঠান।
আবেদনের মূল কারণ ও যুক্তি
চিঠিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে এলডিসি উত্তরণ-প্রস্তুতির সময়কাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর।
সরকারের পক্ষে বলা হয়েছে, সময়সীমা বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কারগুলো সংহত করা এবং স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির (এসটিএস) অধীন অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুযোগ পাওয়া যাবে।
দেশি ও বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণে পাঁচ বছরের প্রস্তুতি সময়কাল একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটে গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে। বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কড়াকড়ি এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা।
দেশি সংকটের মধ্যে আর্থিক খাতে অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এখনো নিষ্পত্তি না হওয়ায় মতো বিষয়গুলোর উল্লেখ করা হয়। এসব অভিঘাতের ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ হ্রাস এবং কর-জিডিপি অনুপাত কমেছে।
বাণিজ্য সুবিধা ও অনিশ্চয়তা
চিঠিতে এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাব্য জটিলতা, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর নতুন মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি।
সরকারের মতে, অল্প সময়ের মধ্যে বাণিজ্য সুবিধা হারালে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও উন্নয়ন গতি দুর্বল হতে পারে। শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জ্বালানি সংস্কার, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের অগ্রগতি হলেও একের পর এক সংকটের কারণে সেগুলো নির্ধারিত সময়ের চেয়ে পিছিয়ে আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উত্তরণের মানদণ্ডের বিচারে এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সুযোগ নেই। তবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের বিষয়টি সামনে আনা যেতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, নতুন দ্রুত সময়ের মধ্যে এলডিসি পেছানোর আবেদন করে ভালো করেছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ভারত, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বন্ধু রাষ্ট্রের সমর্থন প্রয়োজন।
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের ইতিহাস
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসিভুক্ত থাকার সুবাদে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা সুযোগ পেয়ে এসেছে। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছে, যার ফলে ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বের হওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল।
জানা গেছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় পেছানোর আবেদন করে সফল হয়েছে সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, মালদ্বীপ ও নেপালের মতো দেশগুলো। নতুন সরকারের এই আবেদন এখন জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) মূল্যায়ন করবে, এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায়।
