বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করতে নতুন বাণিজ্যমন্ত্রীর জোরালো উদ্যোগ
এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করতে বাণিজ্যমন্ত্রীর উদ্যোগ

বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করতে নতুন বাণিজ্যমন্ত্রীর জোরালো উদ্যোগ

জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বের হয়ে আসার কথা রয়েছে। তবে নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনই এ উত্তরণ বিলম্বিত করার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, "এলডিসি থেকে উত্তরণ বিলম্বিত করতে যা যা করা দরকার, সবই করা হবে।" আজ বুধবার থেকেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করে এগিয়ে যাবে।

বাণিজ্যমন্ত্রীর প্রথম দিনের কার্যক্রম

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর ও বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম আজ ঢাকায় সচিবালয়ে প্রথম অফিস করেন। দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে তারা এলডিসি উত্তরণ, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, রোজার বাজার, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ এবং বেকারত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। এ সময় বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, "এলডিসি থেকে উত্তরণ বিলম্বিত করতে দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবির কথা সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রথম সপ্তাহে চিঠি দিতে বাধ্যবাধকতা না থাকলেও আমরা আজ থেকেই কাজ শুরু করেছি।"

এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত হওয়ার পূর্ব উদাহরণ

জানা গেছে, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ গৃহযুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ২০২৩ সালে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে আবেদন করে তিন বছর অতিরিক্ত সময় পেয়েছে। এছাড়া সুনামির কারণে মালদ্বীপ এবং ভূমিকম্পের কারণে নেপালের এলডিসি উত্তরণও নির্ধারিত সময়ে হয়নি।

বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, "এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করার বিষয়ে নতুন বাণিজ্যমন্ত্রীর উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। অতীতে বিলম্বিত হওয়ার বেশ কয়েকটি উদাহরণ আছে। নতুন সরকারকে এখন বলতে হবে যে আগের সরকারের সিদ্ধান্ত আমরা মানি না এবং নতুন পথনকশা করতে আমাদের সময় দিতে হবে।"

এলডিসি উত্তরণের প্রক্রিয়া ও বাংলাদেশের অবস্থান

জাতিসংঘ প্রতি তিন বছর পরপর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এ তিন সূচকের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয় কোনো দেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্য কি না। বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এলডিসি তালিকাভুক্ত হয় এবং ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে তিন সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। ২০২১ সালে চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে, তবে করোনার কারণে দুই বছর সময় বাড়ানো হয়।

জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সদস্য দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, "এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একার বিষয় নয়, বরং গোটা সরকারের বিষয়। বাংলাদেশ নির্ধারিত সূচকের অনেক ওপরে আছে। পেছাতে গেলে সরকারের সিদ্ধান্ত বদলাতে হবে এবং সিডিপিতে পাঠানো প্রতিবেদন প্রত্যাহার করতে হবে।"

ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও উল্লেখ করেন, উপদেষ্টা পরিষদ গত বছরের মার্চে উত্তরণের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা পাল্টিয়ে এখন নতুন করে বলতে হবে যে দেশে অভাবিত ঘটনা ঘটেছে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। এছাড়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯২টি দেশের মধ্যে ভোটাভুটির জন্যও আবেদন পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করার বিষয়টি এখন সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে উঠে এসেছে, যার জন্য দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজন হবে।