যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কচুক্তি নিয়ে উদ্বেগ: ব্যবসায়ী-অর্থনীতিবিদরা নতুন সরকারের কাছে পর্যালোচনার অনুরোধ
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কচুক্তি নিয়ে উদ্বেগ, পর্যালোচনার অনুরোধ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কচুক্তি নিয়ে উদ্বেগ: ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের পর্যালোচনার দাবি

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদেরা। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রি (বিসিআই) কার্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তাঁরা এই চুক্তির কঠোর শর্তাবলী নিয়ে সতর্কতা জারি করেছেন।

চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে তীব্র সমালোচনা

অনুষ্ঠানে বক্তারা উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই বাণিজ্যচুক্তিতে অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। চুক্তিটি দেশের স্বার্থকে পর্যাপ্তভাবে বিবেচনায় না নিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন অংশগ্রহণকারীরা। তাঁদের মতে, এই চুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে সীমিত করে দিতে পারে এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

বিসিআইয়ের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী স্বাগত বক্তব্যে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে আমাদের দেশের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু কিছু চিন্তার বিষয়ও রয়েছে। যেমন চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কোনো বাংলাদেশি কোম্পানির রপ্তানি করা পণ্যের দাম সে দেশের বাজারে প্রচলিত মূল্য থেকে কম হলে যুক্তরাষ্ট্র ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কারণ, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তার বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করতে পারে।'

গোপনীয়তা ও তাড়াহুড়োর অভিযোগ

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন তাঁর বক্তব্যে বলেন, 'একটা অনির্বাচিত ও অরাজনৈতিক সরকার খুব গোপনীয়ভাবে এবং তাড়াহুড়োর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিটি সই করেছে। চুক্তিতে দেশের স্বার্থ বিবেচনা করা হয়নি। চুক্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজটি নির্বাচিত সরকারের জন্য রাখা উচিত ছিল।'

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান আরও যোগ করেন, 'চুক্তিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) অন্য দেশের কোম্পানিগুলো একই ধরনের সুবিধা চাইতে পারে। সেটি আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এই চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত নীতিমালাগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমাদের অবস্থানকে সীমাবদ্ধ করে ফেলবে।'

পর্যালোচনা ও আইনি কাঠামোর সুপারিশ

অনুষ্ঠানে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে পরবর্তী আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আইনি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার পরামর্শ দেন। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) জ্যেষ্ঠ ফেলো মোস্তফা আবিদ খান পরামর্শ দেন, বাণিজ্যচুক্তির কারণে যদি কোনো আইনে পরিবর্তন আনা লাগে, সেটি যেন দ্রুত সংসদে আলোচনা করা হয়।

অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের এমডি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, 'বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিটি খুবই কঠোর শর্তভিত্তিক, যেখানে অনেক বেঁধে দেওয়া বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে হওয়া চুক্তিতে শর্তগুলো আরও নমনীয় দেখা গেছে।' তিনি পাঁচটি পরামর্শ দেন:

  1. চুক্তিটি অবশ্যই সংসদে পর্যালোচনা সাপেক্ষে অনুসমর্থন করতে হবে।
  2. চুক্তি নিয়ে অযথা আলোচনার পরিবর্তে যথাযথ আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে আগাতে হবে।
  3. চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের ট্যারিফ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
  4. যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে সরকারে কোনো পরিবর্তন হয় কি না, সেটি দেখা যেতে পারে।
  5. সর্বোপরি, আমরা চুক্তিটি আবার পর্যালোচনার কথা বলতে পারি।

নতুন সরকারের কাছে অনুরোধ

নিট পোশাকমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, 'এ ধরনের চুক্তির মাধ্যমে আমরা যে সুবিধা আশা করছিলাম, তা বাস্তবে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা যেন এই চুক্তি আবার পর্যালোচনা করে এবং অংশীজনদের মতামত নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়।'

সভায় অংশগ্রহণকারীরা সর্বসম্মতিক্রমে নতুন সরকারের কাছে এই বাণিজ্যচুক্তিটি আবার পর্যালোচনা করার জন্য জোরালো অনুরোধ জানান। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন যে, ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।