দুই বিশ্বশক্তির শীর্ষ নেতাদের বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠক বসছে বেইজিংয়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই সপ্তাহে মুখোমুখি হচ্ছেন। তবে তাদের এই আলোচনার ওপর বড় ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরান সংকট।
ইরান সংকটের প্রভাব
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে এই বৈঠকটি একবার পিছিয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া ট্রাম্প। সস্তা তেলের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে শি’র সহায়তা চাইবেন তিনি। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় জ্বালানি সরবরাহ ও পণ্য বিক্রিতে বাধা আসায় শি জিনপিংও চান যুদ্ধের অবসান হোক। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকট সমাধান করতে পারলে বিশ্বনেতা হিসেবে শি’র মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পাবে।
হরমুজ প্রণালি ও যুদ্ধের হুমকি
শুক্রবার ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা দিতে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় প্রজেক্ট ফ্রিডম শুরু করতে পারে, যার মধ্যে এবার অন্যান্য বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইরান যুদ্ধ বন্ধের মার্কিন প্রস্তাবে একটি দীর্ঘ উত্তর দিলেও তাতে পারমানবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনও প্রতিশ্রুতি না থাকায় ট্রাম্প তা অগ্রহণযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বাণিজ্য আলোচনা ও ইরান ইস্যু
মার্কিন প্রশাসনের সিনিয়র কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ট্রাম্প ও শি গ্রেট হলে বাণিজ্য আলোচনায় বসলে ইরান ইস্যুটি গৌণ হয়ে পড়বে। তবে উভয় নেতাই নিজ নিজ স্বার্থ হাসিল করতে চাইছেন। চীন বিশেষভাবে চায় বর্তমান ইরানি শাসনব্যবস্থা টিকে থাকুক।
সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি-র উপ-পরিচালক জ্যাকব স্টোকস বলেন, ট্রাম্পকে জেটল্যাগ সামলে একসঙ্গে দুটি জটিল নীতিগত বিষয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। এর আগে এত কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখে তিনি পড়েননি।
দুই দিনের সূচি
দুই দিনের এই ব্যস্ত সূচিতে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন, রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ এবং চা-চক্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আলোচনার মূল কেন্দ্রে থাকবে বাণিজ্য, বিশেষ করে চীনের পক্ষ থেকে মার্কিন কৃষি পণ্য, জ্বালানি এবং বোয়িং বিমানের মতো অ্যারোস্পেস প্রযুক্তি কেনা। এছাড়া একটি ইউএস-চীন বোর্ড অব ট্রেড গঠনের বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের বক্তব্য
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত এক বছর চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য আনা এবং মার্কিন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে ন্যায্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি সেটিই চালিয়ে যাবেন।
ট্রাম্পের সুরে নমনীয়তা
প্রথম মেয়াদে চীনকে আক্রমণ করে কথা বললেও, এবার ট্রাম্পের সুরে কিছুটা নমনীয়তা দেখা যাচ্ছে। গত এপ্রিলে ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছিলেন, শি জিনপিং আমাকে একটি বড় আলিঙ্গন করবেন। তবে সম্পর্কের সবটুকুই মসৃণ নয়। সফরের আগে মার্কিন কর্মকর্তাদের ভিসা দেয়নি বেইজিং, যা বিরল। এছাড়া মার্কিন সাংবাদিকদের ভিসা পেতেও জটিলতা হচ্ছে।
চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প ইরান ও রাশিয়ায় চীনের আর্থিক সহায়তা এবং অস্ত্র রফতানির বিষয়টি তুলতে পারেন। শুক্রবারই চারটি চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্লেষকদের মতামত
সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির স্টোকস মনে করেন, শি চাইবেন মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার শাসক পরিবর্তনের যুদ্ধ যেন ব্যর্থ হিসেবে গণ্য হয়, আর ট্রাম্প চাইবেন তার উল্টোটা।
তবে চীন-ইরান সম্পর্কেও ফাটল আছে। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে একটি চীনা তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ইরান হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
সাবেক মার্কিন আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, এক দশক পর ট্রাম্পের এই চীন সফর খুব একটা আদর্শ অবস্থানে নেই। শুল্ক যুদ্ধ এবং ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের হাতে এখন আগের মতো শক্ত কোনও অস্ত্র নেই, যা শি জিনপিংকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছে।
তাইওয়ান ইস্যু
তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনের কোনও পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন তার উপদেষ্টারা। যদিও এবার বৈঠকে বিষয়টি উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল



