সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্ব: তেল থেকে রাজনীতি, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্ব: তেল থেকে রাজনীতি, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

সৌদি আরব একদা সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-নাহিয়ান পরিবারের এক রাজপুত্রকে বিশাল অঙ্কের ঘুষের প্রস্তাব দিয়েছিল। লক্ষ্য ছিল, তেলসমৃদ্ধ একটি মরু মরূদ্যানের নিয়ন্ত্রণ দখল করা। কিন্তু সেই শেখ তার পরিবারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে রাজি হননি। ফলশ্রুতিতে সৌদি আরব সেই অঞ্চলটিতে আক্রমণ চালায়, যদিও সেই অভিযান শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।

কিংবদন্তি সাংবাদিক ডেভিড হোল্ডেন তার ১৯৬৬ সালের ক্লাসিক গ্রন্থ ‘ফেয়ারওয়েল টু অ্যারাবিয়া’-তে ১৯৫০-এর দশকের সেই বিখ্যাত ‘বুরাইমি বিরোধ’-এর বর্ণনা এভাবেই দিয়েছিলেন। হোল্ডেনের বর্ণনা মতে, সৌদিরা যাকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তিনি ছিলেন জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান, যাকে আজ আমরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জানি। কয়েক দশক পর ইতিহাস যেন আবারও ফিরে এসেছে। তার ছেলে এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজেড) এখন লিপ্ত রয়েছেন সৌদি আরবের আরেক প্রভাবশালী রাজপরিবার সদস্য যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) সঙ্গে এক তিক্ত লড়াইয়ে।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিক থেরোস বলেন, আপনি যদি আদর্শ, পরিবার ও ইতিহাসকে একত্রে মেলান, তবেই সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্বের প্রকৃত রূপ বুঝতে পারবেন। বর্তমানে লিবিয়ার মরুভূমি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার সবখানেই এই দুই দেশ একে অপরের মুখোমুখি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বর্তমান বিরোধের নেপথ্যে

চলতি মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত সৌদি নেতৃত্বাধীন তেল রফতানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক ত্যাগ করেছে। আবুধাবি ঘোষণা করেছে যে, তারা এখন থেকে প্রতিদিন আরও কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল অতিরিক্ত তেল উত্তোলন করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতে সৌদির সঙ্গে এক ভয়াবহ মূল্য যুদ্ধের পূর্বাভাস।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ওপেক ত্যাগের বাহ্যিক কারণ হিসেবে তেল উৎপাদন ব্যবস্থাপনার ভিন্নতাকে দেখা হচ্ছে। আমিরাত দ্রুত বেশি তেল তুলে মুনাফা করতে চায়, আর সৌদি আরব দীর্ঘমেয়াদে দাম ধরে রাখতে বৈশ্বিক সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কিন্তু এই পার্থক্যের গভীরে রয়েছে নেতৃত্বের সংঘাত।

লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রব গেস্ট পিনফোল্ড বলেন, সৌদি আরব তার বিশাল জনসংখ্যা ও খনিজ সম্পদের কারণে নিজেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের স্বাভাবিক নেতা মনে করে। অন্যদিকে আমিরাত ছোট দেশ হলেও তারা নিজেদের একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারা মনে করে, সৌদির কথামতো চললে বিশ্বমঞ্চে তাদের প্রভাব খর্ব হবে।

কেন আমিরাতের অবস্থান শক্তিশালী

ঐতিহাসিকভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত পশ্চিমে নজদ অঞ্চলের সৌদি উপজাতি এবং পূর্বে পারস্যের (ইরান) শক্তির চাপে পিষ্ট ছিল। এমবিজেড এখন সেই প্রাচীন শত্রুতার এক আধুনিক সংস্করণ তুলে ধরছেন। থেরোসের মতে, আমিরাত সবসময়ই সৌদিদের এক ‘শিকারী প্রতিবেশী’ হিসেবে দেখেছে যারা তাদের দাসে পরিণত করতে চায়।

এমবিজেড এখন বিশ্বাস করেন যে, একটি ছোট উপসাগরীয় দেশ হয়েও সৌদি এবং পারস্য উভয়ের বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়ানো সম্ভব। আর একারণেই আমিরাত এখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধের কট্টর সমর্থক। যখন ইরান আমিরাতের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তখন ইসরায়েলই তাদের সুরক্ষায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে।

কীভাবে ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত দুই দেশ

নিজের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে আমিরাত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দেশে স্থানীয় অংশীদার খুঁজে নিচ্ছে, যা রিয়াদকে ক্ষুব্ধ করেছে। সুদান ও ইয়েমেনে এই দুই প্রতিবেশী দেশ সম্পূর্ণ বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে। সুদানের গৃহযুদ্ধে আমিরাত যখন আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস-কে সমর্থন দিচ্ছে, সৌদি তখন এর প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আমিরাতের বিরুদ্ধে লবিং করছে।

ইয়েমেনেও একই চিত্র। সেখানে দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিচ্ছে আমিরাত, যারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির পাশে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়তে চায়। অন্যদিকে সৌদি আরব ইয়েমেনের অখণ্ডতা রক্ষায় ওমানকে সঙ্গে নিয়ে আমিরাতের প্রভাব ঠেকানোর চেষ্টা করছে।

আদর্শিক সংঘাত কোথায়

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর স্কলার হিশাম আলঘান্নাম বলেন, সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গি হলো রাষ্ট্রকে রক্ষা করা এবং নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। পক্ষান্তরে অন্য পক্ষ (আমিরাত) অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা ইসলামপন্থিদের দমনে এতটাই মগ্ন যে তারা মিলিশিয়া বাহিনীকে শক্তিশালী করছে, যা বৈধ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে।

২০১১ সালের আরব বসন্তের পর এই দুই দেশ সাময়িকভাবে এক হয়েছিল। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের জয় এবং ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহ উভয়ের জন্যই হুমকি ছিল। এমনকি কাতারকে বয়কট করার পেছনেও ছিল একই ঐক্য। কিন্তু ২০১০ সালের আগে এবং ২০২০ সালের পরের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের মূল সম্পর্ক আসলে সংঘাতেরই। ২০০৯ সালে আমিরাতের জিসিসি মুদ্রা ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়া ছিল রিয়াদের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এক বড় বিদ্রোহ।

ইসরায়েল ও আঞ্চলিক বলয়ের ভূমিকা কেমন

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই দুই দেশের পথ এখন ভিন্ন। ২০২০ সালে আমিরাত যখন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে, তখন তারা সৌদির তৈরি করা দুই দশক পুরনো শান্তি পরিকল্পনাকে পাশ কাটিয়ে যায়। গাজায় ইসরায়েলের চলমান অভিযানকে এমবিএস প্রকাশ্যে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যেখানে ৯৬ শতাংশ সৌদি নাগরিক ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পক্ষে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান যুদ্ধ এই দুই দেশের মধ্যকার ফাটলকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও দুই দেশই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র, কিন্তু তারা এখন আলাদা আলাদা আঞ্চলিক বলয় তৈরি করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের অংশীদারত্ব দ্বিগুণ করছে। আর সৌদি আরব তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তানকে নিয়ে এক নতুন জোট গড়ার পথে হাঁটছে। থেরোস বলেছেন, উভয় দেশই হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে ত্যাগ করতে পারবে না, কিন্তু তাদের এই নতুন জোটগুলো ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই