মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র একটি গোপন বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কঠোর অর্থনৈতিক সংকটে পড়ার আগে ইরান অন্তত আরও তিন থেকে চার মাস মার্কিন নৌ-অবরোধ মোকাবিলা করার সক্ষমতা রাখে। এ সপ্তাহে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনের তথ্য নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট চারজন ব্যক্তি। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া আশাবাদী বক্তব্য নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অক্ষত
গোয়েন্দা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের টানা বোমাবর্ষণের পরও ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার বড় অংশ অক্ষত রাখতে পেরেছে। এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখনো ইরানের হাতে প্রায় ৭৫ শতাংশ মোবাইল লঞ্চার এবং ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা অধিকাংশ ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগার পুনরায় সচল করেছে এবং নতুন কিছু ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, গত বুধবার ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দেশটির হাতে আগের তুলনায় খুব অল্প অস্ত্র অবশিষ্ট আছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি বনাম বাস্তবতা
ট্রাম্প প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা চলমান সংঘাতকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সামরিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তব পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, তেহরান এখনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর কিংবা হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মতো ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো মানেনি।
ট্রাম্প নৌ-অবরোধকে ‘ইস্পাতের দেয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, এটি ভেদ করা কারও পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন, অবরোধের কারণে খুব শিগগিরই ইরানের প্রধান তেল টার্মিনালগুলো পূর্ণ হয়ে যাবে এবং দেশটির তেল অবকাঠামো স্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়বে।
ইরানের কৌশল ও বিকল্প পথ
তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, ইরানের নেতৃত্ব এখন আরও বেশি অনড় ও কৌশলী অবস্থানে রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, তেহরান বিশ্বাস করে তারা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ধৈর্যের চেয়েও বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে।
এদিকে ওয়াশিংটন পোস্টের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইরানি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনার অন্তত ২২৮টি অবকাঠামো বা সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ধ্বংস হয়েছে। এই সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি দাবি করেছেন, নৌ-অবরোধের কারণে ইরান প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ডলার রাজস্ব হারাচ্ছে। তার ভাষায়, সামরিক অভিযানের পর এখন অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে দুর্বল করে ফেলার চেষ্টা চলছে।
তবে সিআইএ’র মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান ৯০ থেকে ১২০ দিন বা তারও বেশি সময় অবরোধ মোকাবিলা করতে সক্ষম হতে পারে। বর্তমানে দেশটি অবিক্রিত তেল খালি ট্যাঙ্কারে সংরক্ষণ করছে এবং তেলের কূপ সচল রাখতে উৎপাদন সীমিত করেছে। একই সঙ্গে মধ্য এশিয়ার রেলপথ ব্যবহার করে তেল পাচারের মাধ্যমে বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলারও চেষ্টা করছে তেহরান।
ড্রোনের ভূমিকা ও কৌশলগত ব্যর্থতার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে কম খরচের ড্রোন বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ এসব ড্রোন সহজে তৈরি ও গোপনে সংরক্ষণ করা সম্ভব। তেল আবিবভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিজ বলেন, একটি ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলাই আন্তর্জাতিক বীমা সুবিধা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘ অবরোধও হয়তো ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারবে না। তার মতে, যে যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল করা এবং তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, শেষ পর্যন্ত সেটি কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত হতে পারে। বরং এর ফলে ইরান আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসতে পারে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিরুদ্ধে পূর্ণ নৌ-অবরোধ আরোপ করে। বর্তমানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ সম্ভাব্য শান্তি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছে।



