নারী অভিবাসীদের দক্ষতায় ঘাটতি, সিন্ডিকেট-দালাল চক্র বড় বাধা
নারী অভিবাসীদের দক্ষতায় ঘাটতি, সিন্ডিকেট-দালাল চক্র বাধা

বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজের সন্ধানে যাওয়া নারী অভিবাসীর সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে। বিদেশগামী এসব কর্মীর জন্য সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ব্যয়, ঘুষ, দালাল চক্র ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এখনো বড় বাধা। এসব বাধা দূর করে তাঁদের সব সেবা এক ছাতার নিচে আনতে হবে।

গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনা

‘নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপদ অভিবাসন’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা উঠে আসে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। যৌথভাবে এর আয়োজক বাদাবন সংঘ ও প্রথম আলো।

প্রতিমন্ত্রীর পরিকল্পনা

গোলটেবিল বৈঠকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নারী শ্রমিকদের দক্ষ করে বিদেশে পাঠানো, বিদেশে তাঁদের সুরক্ষায় আইনি ফার্ম নিয়োগ, ডিজিটাল ব্যাংকিং–সুবিধা নিশ্চিত ও বিদেশফেরত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে বড় অঙ্কের বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনার কথা জানান। প্রতিমন্ত্রী জানান, সম্প্রতি সরকার লক্ষ করেছে, সরকারের ২৩টি মন্ত্রণালয় একই ধরনের কিছু প্রশিক্ষণ দেয়। এতে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে। তবে ফল আসছে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবছে সরকার উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, যে মন্ত্রণালয়ই প্রশিক্ষণ দিক বা যে সংস্থাই দিক, এটাকে একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসা জরুরি। যাতে প্রশিক্ষণগুলো কার্যকর হয়।

ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু

বিদেশ গমনে ইচ্ছুক নারীদের সেবাপ্রাপ্তি সহজ করতে জেলা পর্যায়ে জনশক্তি অফিস, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক এবং ওয়েলফেয়ার সেন্টারগুলোকে একই ভবনে নিয়ে এসে ওয়ান–স্টপ সার্ভিস চালু, প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু, আদর্শ অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ, ভালো রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে চিহ্নিত করতে গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনার কথা জানান।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ভূমিকা

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পরিচালক (অর্থ ও বাজেট) এ টি এম মাহবুব-উল করিম জানান, বিদেশে অবস্থনরত ব্যক্তিদের অসুস্থতা, মৃত্যু কিংবা আইনি জটিলতায় তাঁদের পাশে থাকছে ওয়েজ আর্নার্স বোর্ড। নারী–পুরুষ যেকোনো প্রবাসী ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পর থেকেই আবার ফেরত আসা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রবাসীদের পাশে থাকার চেষ্টা করে।

আইএলওর পরামর্শ

নারী অভিবাসনে স্বচ্ছতা ও রিক্রুটিং এজেন্সির জবাবদিহি নিশ্চিতের তাগিদ দেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জ্যেষ্ঠ জাতীয় কর্মসূচি ব্যবস্থাপক রাহনুমা সালাম খান। তাঁর মতে, তথ্যের অস্পষ্টতা নারী কর্মীদের শোষণের প্রধান কারণ। এ ছাড়া দেশের কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর (টিটিসি) সংস্কারের কথা বলেন। আইএলওর সহায়তায় বিদেশফেরত নারীদের জন্য বিশেষ ক্যাশ স্কিম চালুর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।

তৃণমূল পর্যায়ে সেবা

নারী অভিবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রাক্‌–সিদ্ধান্ত পর্যায় থেকে কাজ করার আহ্বান জানান রিইন্টিগ্রেশন অ্যান্ড লেবার মোবিলিটি অ্যান্ড সোশ্যাল ইনক্লুশনের ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার ফারজানা শাহনাজ। তিনি বলেন, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের (ইউডিসি) উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সঠিক তথ্য ও কাউন্সেলিং সেবা পৌঁছে দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয় ও ঋণের বোঝা কমাতে বিদেশে যাওয়ার আগেই লাভ–ক্ষতির হিসাব নিশ্চিত করা জরুরি।

বাদাবন সংঘের ভূমিকা

প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রবাসী নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়ন এবং সুরক্ষা নিশ্চিতে বাদাবন সংঘের ভূমিকা তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক লিপি রহমান। তিনি সরকার ও সব পক্ষের কাছে প্রবাসী নারীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে গন্তব্যদেশগুলোতে সরকারের তৎপরতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। বিদেশফেরত নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি দালাল চক্র থেকে বিদেশগামী নারীদের রক্ষায় সরকারের কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের আহ্বান জানান।

বোয়েসেলের কার্যক্রম

জনশক্তি রপ্তানিতে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) কার্যক্রম তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপক (বৈদেশিক নিয়োগ) নু-এমং মারমা। বিদেশের কর্মস্থলে কর্মীদের অধিকার রক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করায় বোয়েসেলের মাধ্যমে গমনকারী ব্যক্তিরা প্রতারণামুক্ত থেকে স্বাবলম্বী হচ্ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মহাপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান

অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিতে সরকারকে পাঁচ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক (বিলস) সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। তিনি অভিবাসন খাতে জবাবদিহি ও কাঠামোগত সংস্কার, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত, সংগঠন করার অধিকার দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব

অভিবাসী নারী কর্মীদের সুরক্ষায় বেতন ও শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের জেন্ডার এক্সপার্ট শারমিন ইসলাম। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পরিবারবিচ্ছিন্ন থাকায় এবং গন্তব্যদেশে প্রতিকূল পরিবেশে নারীরা চরম একাকিত্ব ও মানসিক চাপে ভোগেন। ফিরে আসা নারী কর্মীদের পুনর্বাসনে সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সেলিং নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিকভাবে তাঁদের মর্যাদা নিশ্চিতে জনসচেতনতা বাড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি

শুধু দায়িত্ব পালন নয়, সরকার যাতে অভিবাসী নারী শ্রমিকদের মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের প্রতি যত্নশীল হয়, সেই আহ্বান জানান সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর সেখানে এখন বাজারের ধরন পরিবর্তন হবে। বাংলাদেশকেও সে অনুযায়ী প্রস্ততি নিতে হবে। বিদেশফেরত নারীদের দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁরা বিদেশে যান অপার সম্ভাবনা নিয়ে; আর ফেরত আসেন উপেক্ষা ও অবহেলা নিয়ে। নারীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ থাকলে, উপার্জনের ওপর নারীর নিজের কর্তৃত্ব থাকলে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি

প্রবাসী নারী কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জানান রামরুর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মেরিনা সুলতানা।

বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর শ্রম শাখাকে শক্তিশালী করা এবং নারী কর্মীদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলার দাবি জানান ওয়্যারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক জাছিয়া খাতুন।

অভিবাসন খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জবাবদিহি এবং স্থানীয় দালালদের আইনি কাঠামোর আওতায় আনার দাবি জানান বিএনএসকের পরিচালক এস কে মজিবুল হক।

নারী অভিবাসীদের সুরক্ষায় মাঠপর্যায়ে সরকারি সেবার প্রসার ও আইনি প্রতিকার জরুরি বলে মত দেন অভিবাসনবিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর। তিনি নারী অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় সরকারি উদ্যোগের সুফল তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ব্র্যাকের উদ্বেগ

প্রবাসী কর্মীদের মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষায় বাংলাদেশের বর্তমান নীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির কো–অর্ডিনেটর মো. হারুন-অর-রশীদ। তিনি বলেন, শুধু রেমিট্যান্সের দিকে না তাকিয়ে সরকার যেন নারী কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।

অন্যান্য বক্তা

গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ইউএন ন্যাশনস ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের জেলা প্রকল্প সহযোগী ফরহাদ আল করিম, বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএমএসএ) সাধারণ সম্পাদক শেখ রোমানা, অভিবাসী নারী শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা সুলতানা, উন্নয়ন অধিকারকর্মী শাহজাদী বেগম, অভিবাসী নারী শ্রমিক ফেডারেশনের সভানেত্রী মোছা. মরিয়ম।

প্রবন্ধ উপস্থাপন ও সঞ্চালনা

গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাদাবন সংঘের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ফারিহা জেসমিন। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।