হরমুজ সংকটে পরিশোধিত জ্বালানির তীব্র ঘাটতি, উদ্বেগ গোল্ডম্যানের
হরমুজ সংকটে পরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতি, উদ্বেগ গোল্ডম্যানের

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ কার্যত অচল হয়ে পড়ায় সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হলেও— বৈশ্বিক তেলের মজুত পুরোপুরি ফুরিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। তবে সংকট দেখা দিচ্ছে তেল থেকে উৎপাদিত কিছু পরিশোধিত জ্বালানি ও উপজাত পণ্যে, যা বিমান চলাচল ও শিল্পকারখানার সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গোল্ডম্যান স্যাকসের সতর্কবার্তা

বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকরা সাম্প্রতিক এক নোটে এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। সোমবার (৪ মে) প্রকাশিত ওই নোটে গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকরা লিখেছেন, ‘কিছু অঞ্চল এবং নির্দিষ্ট পণ্যের মজুতে যে দ্রুত অবনতি এবং সরবরাহ ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সহজে ব্যবহারযোগ্য পরিশোধিত পণ্যের আপৎকালীন মজুদ দ্রুত তলানিতে ঠেকছে।’

এর কারণ হলো, অপরিশোধিত তেলের সামগ্রিক মজুদ এখনো বিপজ্জনক সীমার উপরে থাকলেও— বিমান চলাচলের জ্বালানি (জেট ফুয়েল), রাসায়নিক শিল্পের কাঁচামাল যেমন ‘ন্যাফথা’ এবং প্লাস্টিক ও রাসায়নিক তৈরিতে ব্যবহৃত তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মতো পরিশোধিত পণ্যগুলোতে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিশোধিত পণ্যের মজুতের চিত্র

গোল্ডম্যানের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী পরিশোধিত পণ্যের বাণিজ্যিক মজুত ৪৫ দিনের চাহিদা পূরণের মতো স্তরে নেমে এসেছে, যা সাম্প্রতিক অস্থিরতা শুরু হওয়ার আগে ছিল প্রায় ৫০ দিনের সমান। এর বিপরীতে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের মোট মজুত বর্তমানে প্রায় ১০১ দিনের চাহিদার সমপরিমাণ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্লাস্টিক এবং শিল্প রাসায়নিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ন্যাফথার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানিকেন্দ্র ফুজাইরাহ বন্দরের স্টোরেজে এর মজুদ ৭২ শতাংশ এবং উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের আমস্টারডাম-রটারডাম-অ্যান্টওয়ার্প হাবে ৩৭ শতাংশ কমেছে।

ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল ও খাত

চীন ছাড়া এশিয়ার অন্যান্য অংশ এবং ইউরোপের কিছু এলাকা পরিশোধিত জ্বালানির এই সংকটের মুখে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। গোল্ডম্যানের বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, থাইল্যান্ড এবং তাইওয়ানও এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এমনকি যেখানে অপরিশোধিত তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেও সেগুলোকে সবসময় দ্রুত ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না।

রিফাইনিংয়ের সীমাবদ্ধতা, বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া এবং রপ্তানি বিধি-নিষেধের ফলে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এর অর্থ হলো, এক স্থানের উদ্বৃত্ত তেল দিয়ে অন্য স্থানের ঘাটতি সহজে পূরণ করা যাচ্ছে না।

বিমান চলাচল খাতে প্রভাব

এই সংকটের প্রতিফলন সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে বিমান চলাচল খাতে। জেট ফুয়েলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিশ্বের বড় বড় বিমান সংস্থাগুলো অনেক ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। প্রভাবশালী বিনিয়োগ ব্যাংকটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, ইউরোপের বাণিজ্যিক জেট ফুয়েলের মজুত (সরকারি আপৎকালীন মজুদ বাদে) আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার বেঁধে দেওয়া ২৩ দিনের সর্বনিম্ন সীমা অতিক্রম করে— আগামী জুনেই আরও নিচে নেমে যেতে পারে।

হরমুজ প্রণালির প্রভাব ও তেলের দাম

গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। হরমুজ প্রণালিতে দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ফলে, অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্য মূল্য বা ফিউচার প্রাইস ইতোমধ্যেই ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিশ্লেষকরা লিখেছেন, ‘যদি হরমুজ প্রণালিতে (জ্বালানিবাহী) জাহাজের যাতায়াত এখনই স্বাভাবিক হতে শুরু করে, তবুও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরতে অন্তত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে।’

আজ মঙ্গলবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার প্রতি ব্যারেল ১১৩ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড ছিল ব্যারেল প্রতি ১০৪ ডলারের কাছাকাছি।