ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৪, চলছে উদ্ধার অভিযান
ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃত ১৬৪, চলছে উদ্ধার

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা ভয়াবহ এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাণহানির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ। ধসে পড়েছে অসংখ্য ভবন, ব্যাহত হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, আর আতঙ্কে ঘর ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিচ্ছেন হাজারো মানুষ। উদ্ধারকর্মীরা দিন-রাত কাজ করলেও ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৪

দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, শক্তিশালী এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ। নিহত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কারণ অনেক এলাকা এখনও পুরোপুরি উদ্ধার কার্যক্রমের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। ভূমিকম্পের পরপরই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস এবং স্বেচ্ছাসেবীরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী কম্পন

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, বুধবার সন্ধ্যায় প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২। এর কেন্দ্রস্থল ছিল ইয়ারাকুয়ি অঙ্গরাজ্যের সান ফেলিপে এলাকায়। প্রথম কম্পনের মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর আরও শক্তিশালী দ্বিতীয় ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫। অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজধানী কারাকাসে ভয়াবহ পরিস্থিতি

ভূমিকম্পের তীব্র কম্পন রাজধানী কারাকাসেও অনুভূত হয়। শহরের বিভিন্ন স্থানে বহুতল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কিছু ভবন ধসে পড়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের আর্তনাদ উদ্ধারকর্মীদের সামনে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দ্রুত ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

আফটারশকের আতঙ্কে খোলা আকাশের নিচে রাত

প্রধান ভূমিকম্পের পর থেকে দেশজুড়ে ২০টিরও বেশি আফটারশক অনুভূত হয়েছে। ফলে নতুন করে ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক মানুষ নিরাপত্তার জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায়, খোলা মাঠে এবং অস্থায়ী তাঁবুতে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উদ্ধার সংস্থাগুলোও নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

কেন এত শক্তিশালী ছিল এই ভূমিকম্প?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলা এমন একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে ক্যারিবীয় এবং দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল রয়েছে। এই দুটি প্লেটের পারস্পরিক গতিশীলতার কারণেই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকম্পপ্রবণ হিসেবে পরিচিত। ইউএসজিএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দ্বিতীয় ও অধিক শক্তিশালী ভূমিকম্পটি ‘অগভীর স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্টিং’-এর ফলে সংঘটিত হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় ভূত্বকের দুটি অংশ অনুভূমিকভাবে দ্রুত সরে যায়, যার ফলে শক্তিশালী কম্পনের সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই দুটি ভূমিকম্প একটি জটিল ভূ-গাঠনিক ভঙ্গুরতা বিস্তারের ইঙ্গিত বহন করছে, যা ভবিষ্যতে আরও কম্পনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকাগুলো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—লা গুয়াইরা, আরাগুয়া, কারাবোবো ও ফ্যালকন। এসব এলাকায় বহু বাড়িঘর, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায়ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক এই ভূমিকম্প শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং দেশটির জন্য এক গভীর মানবিক সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে। শতাধিক প্রাণহানি, হাজারো মানুষের আহত হওয়া এবং ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি দেশটিকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে। আফটারশকের আশঙ্কা এখনও কাটেনি, ফলে উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে। এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং দ্রুত পুনরুদ্ধার কার্যক্রম নিশ্চিত করা এখন ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।