চীনে বিদেশি হিসেবে পাওয়া মানবিকতার অনন্য অভিজ্ঞতা
চীনে বিদেশি হিসেবে মানবিকতার অনন্য অভিজ্ঞতা

১ বছর ৫ মাস ১৫ দিন আগে যখন আমি প্রথম চীনে পা রাখি, তখন আমি ছিলাম একেবারেই অনভিজ্ঞ এক মানুষ। দেশ, সংস্কৃতি, ভাষা—সবকিছুই ছিল আমার জন্য নতুন। আমার আশপাশে কোনো বাংলাদেশি তো দূরে থাক, কোনো বিদেশিও ছিল না। আমার সঙ্গে ছিল সীমিত কিছু শব্দভান্ডার—‘নি হাও’, ‘নি হাও মা’, ‘দাম কত’, ‘৫০০ গ্রাম দিন’, ‘এটা’, ‘ওটা’—এ পর্যন্তই। কথোপকথন চালানো তো দূরের কথা, চারপাশে মানুষ কী বলছে, সেটাও বুঝতে পারতাম না। কিন্তু খুব দ্রুতই কিছু বিষয় বুঝতে শিখলাম—মানুষের মুখভঙ্গি, দৃষ্টি আর আচরণ এমন এক ভাষা, যা শব্দের সীমা ছাড়িয়ে যায়।

প্রথম পরিচয় ও আন্তরিকতা

আমি এমন একটি দেশের মানুষ, যেটাকে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের জন্য সবেমাত্র নির্বাচন করা হয়েছে। তাই আধুনিক চীনা নগরজীবনে নিজেকে খাপ খাওয়ানো আমার জন্য সহজ ছিল না। প্রথম আট মাস আমি চিয়াংসু প্রদেশের ‘কুনশান’ শহরে ছিলাম। শীতের তীব্রতা, গ্রীষ্মের প্রখরতা, নতুন পরিবেশের অচেনা চাপ—সব মিলিয়ে সময়টা ছিল কঠিন। অনেক সময় নিজেকে একাকী ও অসহায় মনে হয়েছে। ঠিক সেই সময়েই আমার জীবনে এসে দাঁড়ান কিছু মানুষ, যাঁরা আমার সেই নিঃসঙ্গতার ভার নীরবে শেয়ার করে নেন।

কুনশানে আমার প্রথম পরিচয় হয় এক স্থানীয় তরুণের সঙ্গে, অফিস থেকে তার সঙ্গে আমাকে ট্যাগ করে দেওয়া হয়েছিল। তার চীনা নাম সম্ভবত ‘আথাই’, এই নামে আমি তাকে ডাকতাম, যদিও আমি তার সঠিক উচ্চারণ নিয়ে নিশ্চিত নই। তবে তার আচরণ আমি কখনো ভুলব না। শুরু থেকেই সে আমাকে একজন বিদেশি হিসেবে নয়, বরং পরিবারের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কোথাও যেতে হলে সে সঙ্গে যেত, দৈনন্দিন কাজগুলো সহজ করে দিত, আর যখন জানতে পারল আমি মুসলিম, সব চীনা খাবার খেতে পারি না, তখন আমাকে হালাল রেস্তোরাঁয় নিয়ে গেল, অনেকবার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অপ্রত্যাশিত ভাই ও বোনের স্নেহ

চীনে আমার প্রথম ১৫ দিনে সে নিজের অর্থ ব্যয় করে আমাকে প্রয়োজনীয় অনেক কিছু কিনে দিয়েছিল কোনো দ্বিধা বা প্রত্যাশা ছাড়াই। সে প্রায়ই আমাকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করত এবং বলত, ‘উই আর ব্রাদার্স।’ ভিনদেশে এসে এমন এক ভাই পাওয়া সত্যিই আমার জন্য অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্য ছিল।

আমার কর্মস্থলেও আমি পেয়েছিলাম আরেকজন সহায়ক মানুষ, যাকে আমি ‘মিস উ’ নামে ডাকতাম। তিনি আমার জন্য শুধু সহকর্মী ছিলেন না; বরং এক অভিভাবকের মতো পাশে ছিলেন। বাসা খোঁজা থেকে শুরু করে সেকেন্ড হ্যান্ড ফ্রিজ ও মাইক্রোওভেন কেনা—প্রতিটি ছোট-বড় প্রয়োজনে তিনি আমাকে সহায়তা করেছেন। নিজের ব্যস্ততার মধ্যেও কখনো আমার জন্য সময় দিতে তিনি পিছপা হননি।

অনেক সময় নতুন পরিবেশের চাপে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তাম। সেই সময়ে মিস উ মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন, আমাকে কম খরচ করতে বলেছেন, সঞ্চয় করতে বলেছেন। তাঁর হাজবেন্ডও আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। এমনকি চাকরি পরিবর্তন করে আমি যখন ‘সুচৌ’ শহরে চলে আসি, তখনো তিনি তাঁর সহায়তার হাত বাড়িয়ে রেখেছেন, আমার জিনিসপত্র প্যাক করতে সহায়তা করেছেন, গাড়ি ভাড়া করে দিয়েছেন, এমনকি বাসা ভাড়ার অগ্রিম টাকাও আমাকে ধার দিয়েছেন। আমার নিজের কোনো বোন ছিল না, এই দূর পরবাসে তাঁর মধ্যে আমি এক বোনের স্নেহ খুঁজে পেয়েছি।

মায়ের মতো স্নেহ ও অচেনা মানুষের ভালোবাসা

আমার বাসার কাছেই ছিল একটি ছোট খাবারের দোকান, যার মালিক এক নারী, তাঁর নাম আমি আজও জানি না। তিনি আমার পরিস্থিতি অনুধাবন করেছিলেন নিঃশব্দেই। মাত্র ১০ ইউয়ানে তিনি আমাকে যতখুশি খাবার নিতে দিতেন, যদিও আমি কখনো অতিরিক্ত খাবার নেয়নি। কখনো কখনো তিনি বিনা মূল্যেও খাবার দিয়েছেন। তিনি প্রায়ই উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইতেন, এত অল্প খাবার নিয়ে আমি কীভাবে রাত কাটাই। তাঁর এই মমতাময় আচরণ আমাকে মায়ের স্নেহের কথা মনে করিয়ে দিত। মা যেমন ছোটবেলায় কম খেলে উদ্বিগ্ন হতেন, ঠিক তেমনই। কয়েকবার তাঁর এই যত্নে আমার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছে। বাসা পরিবর্তনের সময়ও তিনি ও তাঁর স্বামী আমাকে সাহায্য করেছেন। তাঁদের এই আন্তরিকতা ভাষা, সংস্কৃতি বা ধর্ম—সবকিছুর সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল।

বর্তমানে আমি ‘সুচৌ’ শহরে কর্মরত। এখানেও আমি একই রকম আন্তরিকতা অনুভব করি। আমার সহকর্মীরা ব্যস্ততার মধ্যেও আমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করেন। এমনকি অনেকেই সচেতনভাবে আমার সামনে চীনা ভাষা ব্যবহার এড়িয়ে চলেন এবং ইংরেজিতে কথা বলার চেষ্টা করেন, যদিও সেটি এক বা দুই শব্দেই সীমাবদ্ধ থাকে।

ভাষা শেখানো থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

সুচৌতে এসে আমি আরও কিছু অসাধারণ মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি, যাঁরা আমার এই ভিনদেশের জীবনে নতুন করে স্বস্তি ও সাহস জুগিয়েছেন। আমার কর্মস্থলে একজন বিনয়ী সহকর্মী আছেন, যাকে আমি ‘মিস শিয়াও ওয়েই’ নামে ডাকি। কোম্পানিতে যোগদানের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ তিনি প্রতিদিন নিয়মিত আধা ঘণ্টা সময় বের করে আমাকে চীনা ভাষার প্রাথমিক পাঠ শেখাতেন। শুধু ভাষা শেখানোই নয়, অনলাইন থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা, কুরিয়ার পাঠানো ও গ্রহণ করা—এসব দৈনন্দিন কাজেও তিনি আমাকে নিরলসভাবে সহায়তা করেছেন। এমনকি আমার চুল কাটার মতো ছোট্ট একটি বিষয়েও তিনি পাশে দাঁড়িয়েছেন। আরও এমন-এমন সাহায্য করেছেন, যা না করলে আমার পরবাসজীবন কঠিন হয়ে যেত।

তাঁর মধ্যে আমি কুনশানের মিস উর মতোই এক আন্তরিকতার প্রতিফলন দেখতে পাই—একই রকম সহানুভূতি, একই রকম আপন করে নেওয়ার মানসিকতা, একই রকম ‘বোনসুলভ’ আচরণ। আমি যখনই তাঁর কাছে কোনো সহায়তার জন্য গিয়েছি, তিনি কখনো বিরক্ত হননি বা অস্বস্তি প্রকাশ করেননি। বরং প্রতিবারই এক আন্তরিক হাসি নিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

গভীর রাতে উদ্ধার ও বসের সংবেদনশীলতা

এ ছাড়া আমার আরেক সহকর্মী আছেন, যিনি পেশায় একজন গ্রাফিক ডিজাইনার এবং ছবি ও ভিডিও সম্পাদনায় অত্যন্ত দক্ষ। তাঁর নাম আমি কখনো সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারি না, কিন্তু তাঁর সহানুভূতি আমি গভীরভাবে অনুভব করেছি এক বিশেষ ঘটনার মাধ্যমে। একবার ভুলবশত আমি একই নামের আরেকটি ‘সুচৌ’ ভেবে অন্য একটি প্রদেশগামী ট্রেনে উঠে পড়েছিলাম এবং অনেক রাতে সেই স্টেশনে নেমে বিরাট বিপদে পড়েছিলাম। গভীর রাতে সেই অচেনা পরিস্থিতিতে পড়ে আমি দিশাহারা হয়ে পড়ি। ঠিক তখনই তিনি দূর থেকে আমাকে পথনির্দেশনা দেন, স্থানীয় রেলস্টেশনের এক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এবং আমাকে নিরাপদে ফিরে আসার ব্যবস্থা করে দেন। তাঁর এই সহায়তা আমার কাছে এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

আমার কর্মস্থলের প্রধানের (একজন অত্যন্ত স্নেহশীল ও মেধাবী নারী) কথাও আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হয়। আমি তাঁকে প্রায়ই মনে মনে ‘বিউটি উইথ ব্রেন’ বলি। তাঁর মতো চৌকস ও কর্মঠ বস পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এত বড় একটা কোম্পানির বস হয়েও তিনি নিরহংকারী ও সবার সঙ্গে তাঁর আচরণ বন্ধুসুলভ। তিনি আমাকে তাঁর নিজের ডেস্কের কাছাকাছি বসার সুযোগ দিয়েছেন, যাতে আমি তাঁর সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে পারি এবং প্রয়োজনে তাঁকে ইংরেজি শেখাতে পারি। একই সঙ্গে এই ব্যবস্থা আমাকে বড় কর্মপরিবেশে, অনেক মানুষের মধ্যে বসে যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো, তা থেকেও মুক্তি দিয়েছে। তাঁর এই সংবেদনশীলতা ও যত্নশীলতা আমার কাজের পরিবেশকে অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক করে তুলেছে।

মানবিকতা সর্বজনীন ভাষা

এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে একটি গভীর সত্য শিখিয়েছে—ভালোবাসা, মমতা ও সম্মান প্রকাশের জন্য একই ভাষা, একই সংস্কৃতি বা একই বিশ্বাসের প্রয়োজন হয় না। মানবিকতা নিজেই একটি সর্বজনীন ভাষা।

আমি হয়তো তাঁদের এই সাহায্যের প্রতিদান দিতে পারিনি বা পারি না, অথবা কোনো দিন পারবও না, কিন্তু আন্তরিকভাবে তাঁদের জন্য দোয়া করেছি। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে মন থেকে কামনা করি, তাঁরা ও তাঁদের পরিবার সুস্থ, শান্তিপূর্ণ ও সুখী জীবন লাভ করুক। একটি গরিব দেশের একজন কালো বর্ণের ছেলের প্রতি যে মমতা তাঁরা দেখিয়েছেন, আল্লাহ যেন তা বহুগুণে তাঁদের ফেরত দেন। আমিন!

এই লেখা লিখতে গিয়েও আমার চোখ আবার অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠছে। কারণ, গভীর কৃতজ্ঞতা কখনো নিঃশব্দে থাকে না।

চীনের প্রকৃত শক্তি তার সাধারণ মানুষ

চীনকে ইতিবাচকভাবে উন্নয়ন, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়; কিন্তু নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করা হয় ভাষা ও খাদ্যাভ্যাসের প্রতিবন্ধকতা দিয়ে। কিন্তু আমার কাছে চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সাধারণ মানুষের অন্তর্নিহিত মানবিকতা, মানুষ হিসেবে মানুষকে মূল্যায়ন করার মহানুভবতা, মানুষের প্রতি অপরিসীম মায়া ও মমতা। একজন বিদেশি হিসেবে আমি এখানে শুধু একটি বসবাসের বা কাজের স্থান খুঁজে পাইনি; খুঁজে পেয়েছি মানুষের প্রতি মানুষের আন্তরিক মমতার কিছু অনুকরণীয় উদাহরণ।

আর সেই মানবিকতা, মহানুভবতা ও মমতার ভাষা—সর্বজনীন, সীমাহীন।

*লেখক: ফরহাদ রহমান রামীম, সুঝৌ, চিয়াংসু, চীন