মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হবে বাস্তবসম্মতভাবে। কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাঁচটি দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা কেবল একটি একাডেমিক গবেষণার অংশ ছিল না, এটি ছিল সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা লাখো মানুষের জীবনসংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ। গত ১০ থেকে ১৪ মে ২০২৬ পর্যন্ত পরিচালিত এই মাঠ গবেষণায় সরাসরি পর্যবেক্ষণ, গভীর সাক্ষাৎকার এবং নথিভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে উঠে এসেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাস্তবতার এক বহুমাত্রিক চিত্র।
বাস্তবতার প্রাথমিক পাঠ
শিবিরে প্রবেশের আগে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে ব্রিফিংয়ে অংশ নেওয়া হয়। সেখানে স্পষ্ট করা হয় যে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের কোনো আইনগত সুযোগ নেই। ফলে জীবিকার প্রায় সম্পূর্ণ চাপ পড়েছে অনানুষ্ঠানিক ও অনিরাপদ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর।
মাজং-এর গল্প: বেঁচে থাকার হিসাব এক মাছের স্টলে
শিবিরের ব্যস্ত বাজারে দেখা মেলে ২৪ বছর বয়সী মাছ বিক্রেতা মাজং-এর সঙ্গে। পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের ভরণপোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তাঁর একার কাঁধে। ছোট একটি মাছের স্টলই তাঁর সংসারের একমাত্র অবলম্বন। তিনি বললেন, ‘আমি মাছ চিনি, মানুষ কী চায় তা বুঝি। বিক্রি হলে পরিবার খেতে পায়।’ মাজং-এর কথায় স্পষ্ট অভিযোগ নেই, আক্ষেপ নেই; আছে শুধু টিকে থাকার অদম্য প্রত্যয়। রোহিঙ্গা শিবিরের অর্থনীতির এই অনানুষ্ঠানিক চেহারাটিই আসলে হাজার হাজার পরিবারের প্রাণশক্তি।
আজিজের বিশ্বাসভিত্তিক ব্যবসা: কাগজবিহীন অর্থনীতির পাঠ
শিশুদের পোশাক বিক্রেতা আজিজ শিবিরের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মুখ। সীমিত ক্রয়ক্ষমতার ক্রেতাদের তিনি প্রায়ই বাকিতে পণ্য দেন। কোনো লিখিত চুক্তি নেই, কোনো ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড নেই, শুধু পারস্পরিক বিশ্বাসই তাঁর ব্যবসার ভিত্তি। আজিজের এই ব্যবসায়িক মডেল দেখিয়ে দেয় যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরেও মানবিক সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে একটি টেকসই অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে।
মারিয়ার শ্রেণিকক্ষ: অনিশ্চয়তার মাঝে শিক্ষার আলো
মারিয়া একটি অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্রে শিশুদের পাঠদান করেন। মিয়ানমারে অর্জিত শিক্ষাগত অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে তিনি নতুন প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের পথ উন্মুক্ত রাখার চেষ্টা করছেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, ‘শিক্ষা ছাড়া ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব নয়।’ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাইরে থেকেও যে একজন মানুষ সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন লালন করতে পারেন, মারিয়া তার জীবন্ত প্রমাণ।
নারী মাঝি: সামাজিক বাধা পেরিয়ে নেতৃত্বের নতুন সংজ্ঞা
গবেষণার সবচেয়ে অভাবনীয় অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল একজন নারী মাঝির সঙ্গে সাক্ষাৎ। পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর মধ্যেও তিনি সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং বাসিন্দাদের সঙ্গে প্রশাসনের যোগাযোগ রক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছেন। তাঁর উপস্থিতি ও সাহস প্রমাণ করে যে সংকটের মুহূর্তে নারীর নেতৃত্ব-সক্ষমতা কোনো ব্যতিক্রম নয়, এটি একটি বাস্তব শক্তি।
স্থানীয় শ্রমবাজার: মানবিক সংকট ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ
মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, স্থানীয় বাংলাদেশি দিনমজুরদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্বল্প মজুরির প্রতিযোগিতায় অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক নয়, মানবিক ও নীতিগত উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এটি একটি জটিল সমীকরণ। এর সুষম সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিকাঠামো প্রয়োজন, যেখানে শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী উভয়ের স্বার্থ বিবেচিত হবে।
পরিসংখ্যান নয়, মানুষের মুখ
পাঁচ দিনের এই মাঠ গবেষণা কেবল তথ্য সংগ্রহের অভিজ্ঞতা নয়, এটি ছিল নিজেকে পুনর্বিন্যস্ত করার একটি যাত্রা। মাজং, আজিজ, মারিয়া এবং নারী মাঝি—প্রত্যেকেই সীমিত সুযোগের মাঝে মানবিক মর্যাদা রক্ষা করে বেঁচে থাকার নিজস্ব পথ তৈরি করছেন। তাঁরা পরিসংখ্যানের ঘরে আটকানো সংখ্যা নন; তাঁরা জীবন্ত মানুষ প্রতিটি স্বপ্ন, প্রতিটি সংগ্রাম নিয়ে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যেকোনো আলোচনা বা নীতিনির্ধারণে এই মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর যদি কেন্দ্রে না আসে, তা হলে সেই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি ন্যায়বিচারের অপরিহার্য শর্ত।
ইমাম মেহেদি হাসান জিহাদ গবেষক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)



