মহানবী (সা.)-এর শিক্ষাদানের আরও ৯টি কালজয়ী কৌশল
মহানবী (সা.)-এর শিক্ষাদানের আরও ৯টি কালজয়ী কৌশল

বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল চিরআধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত। প্রথম পর্বে আমরা তাঁর হাতে-কলমে শিক্ষা, ধারাবাহিকতা ও প্রশ্নোত্তর পদ্ধতির মতো ছয়টি মৌলিক কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছি। সুন্নাহর আলোকে তাঁর শিক্ষাদানের আরও কিছু কালজয়ী কৌশল তুলে ধরা হলো:

৭. উপমা ও উদাহরণের ব্যবহার

জটিল বিষয়কে অধিকতর স্পষ্ট করার জন্য নবীজি (সা.) চাক্ষুষ উপমা দিতেন। তিনি বলেন, ‘যে মুমিন কোরআন পাঠ করে, তার উদাহরণ হলো কমলালেবুর মতো; যার ঘ্রাণ স্নিগ্ধ এবং স্বাদও খুব মিষ্টি। আর যে মুমিন কোরআন পাঠ করে না, তার উদাহরণ হলো খেজুরের মতো; যা সুস্বাদু কিন্তু ঘ্রাণহীন। সৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো কস্তুরী বিক্রেতার মতো এবং অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো কামারের হাপরের মতো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮২৯)

৮. দৃশ্যমান চিত্র বা রেখা অঙ্কন

নবীজি মাঝেমধ্যে তাত্ত্বিক বিষয় সহজে বোঝানোর জন্য মাটির ওপর দাগ টেনে ছবি বা নকশা আঁকতেন। জাবির (রা.) বলেন, ‘আমরা নবীজির কাছে বসা ছিলাম। তিনি হাত দিয়ে মাটির ওপর একটি সোজা রেখা টানলেন এবং বললেন, এটি মহান আল্লাহর পথ। এরপর তিনি ওই রেখাটির ডানে ও বাঁয়ে দুটি করে রেখা টানলেন এবং বললেন, এগুলো শয়তানের পথ। এরপর তিনি তাঁর হাতটি মাঝখানের সোজা রেখাটির ওপর রেখে সুরা আনআমের ১৫৩ নম্বর আয়াতটি পাঠ করলেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, ৩/৩৯৭)

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

৯. কথা ও শারীরিক ইশারার সমন্বয়

তিনি বক্তব্যের পাশাপাশি হাতের ইশারাও ব্যবহার করতেন। এ বিষয়ে তাঁর একটি হাদিস হলো, ‘এক মুমিন অন্য মুমিনের জন্য একটি ইমারত বা দেয়ালসদৃশ, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে।’ এটি বোঝাতে তিনি তাঁর এক হাতের আঙুল অন্য হাতের আঙুলের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেখালেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪৬)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১০. প্রশ্ন করার প্রতি উৎসাহ প্রদান

জ্ঞানের প্রথম ধাপ হলো কৌতূহল। জাবির (রা.) বলেন, এক সফরে এক আহত সাহাবিকে ভুল সমাধান দেওয়ার কারণে সে গোসল করে মারা যায়। নবীজির নিকট খবর এলে তিনি বললেন, ‘এরা অন্যায়ভাবে তাকে হত্যা করেছে। আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন।’ তিনি এই অজ্ঞতার তীব্র নিন্দা করে বললেন, ‘তারা যখন সমাধান জানত না, তখন জিজ্ঞেস করে কেন জেনে নিল না? কারণ, অজ্ঞতার প্রতিষেধক হলো প্রশ্ন করা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৩৬)

১১. মেধা পরীক্ষা ও স্বীকৃতি দান

তিনি সাহাবিদের চিন্তাশক্তি পরীক্ষা করতেন এবং উত্তীর্ণ হলে বাহবা দিতেন। মুআজ ইবনে জাবালকে যখন ইয়েমেনে বিচারক হিসেবে পাঠান, তখন তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঠিক যোগ্যতা দেখে নবীজি খুশি হয়ে তাঁর বুকে হাত দিয়ে মৃদু আঘাত করেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করেন। তিনি জিজ্ঞেস করলে, তোমার নিকট যখন কোনো মোকদ্দমা আনা হবে, তখন তুমি কিসের ভিত্তিতে এর ফয়সালা করবে? তিনি বললেন, আল্লাহর কিতাব মোতাবেক। নবীজি বললেন, তুমি যদি আল্লাহর কিতাবে এর কোনো ফয়সালা না পাও? মুআজ বললেন, তাহলে রাসুলের সুন্নত অনুযায়ী। নবীজি বললেন, তুমি যদি সুন্নত এবং আল্লাহর কিতাবে এর ফয়সালা না পাও? মুআজ বললেন, তাহলে আমি ইজতিহাদ করব এবং অলসতা করব না। তখন মহানবী (সা.) মুআজের বুকে হাত দিয়ে মৃদু আঘাত করলেন এবং বললেন, ‘সব প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য, যিনি আল্লাহর রাসুলের প্রতিনিধিকে এমন বিষয় অনুসরণের তৌফিক দিয়েছেন, যা আল্লাহর রাসুলকে সন্তুষ্ট করে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৯২)

১২. ঐতিহাসিক কাহিনির মাধ্যমে শিক্ষাদান

গল্পের মাধ্যমে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা সহজ। রাসুল (সা.) পূর্ববর্তীদের শিক্ষণীয় গল্প বলতেন। যেমন তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়ে এক ব্যক্তির পাপমুক্তির বিখ্যাত ঘটনাটি বর্ণনা করে তিনি সাহাবিদের মানবতা ও জীবপ্রেমের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বললেন, ‘এক লোক রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। সে খুব তৃষ্ণার্ত। সে একটি কূপ দেখতে পেয়ে তাতে নেমে পড়ল এবং পানি পান করল। এরপর বেরিয়ে এল। দেখল যে (তৃষ্ণায় কাতর) একটি কুকুর জিব বের করে হাঁপাচ্ছে আর মাটি চাটছে। লোকটি (মনে মনে) বলল, কুকুরটিরও আমার মতো তীব্র তৃষ্ণা পেয়েছে। সে কুয়ায় নামল এবং তার (চামড়ার) মোজায় পানি ভরল এবং কুকুরটিকে পান করাল। মহান আল্লাহ তার (এ আমলের) কদর করলেন এবং তাকে মাফ করে দিলেন। সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, পশুদের সেবা করলেও কি আমাদের সওয়াব হবে? তিনি বললেন, প্রত্যেক প্রাণীর সেবা করার মধ্যেই সওয়াব রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৭৫২)

১৩. পরিস্থিতি অনুযায়ী কঠোরতা অবলম্বন

ক্ষেত্রবিশেষে কঠোরতাও শিক্ষার একটি ফলপ্রসূ মাধ্যম। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, নবীজি কোনো একসময় আমাদের সামনে এসে দেখলেন যে আমরা তাকদিরবিষয়ক বিতর্ক করছি। তিনি ভীষণ রাগান্বিত হলেন, এতে তাঁর মুখমণ্ডল লাল বর্ণ ধারণ করল এবং তিনি আমাদের এই অবান্তর বিতর্ক থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করলেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৩৩)

১৪. নথিভুক্তকরণ ও লেখার মাধ্যমে শিক্ষা

নবীজির ওহি লেখক ছিলেন পঁচিশ জনের অধিক। যাঁরা কোরআনের আয়াতগুলো লিখে রাখতেন। কেউ কেউ আবার নবীজির চিঠিপত্র লেখার কাজে নিয়োজিত ছিলেন, যেগুলো পাঠানো হতো রাজা-বাদশাদের কাছে। কেউ কেউ আবার অন্যান্য বিষয়াদি লিখত। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, ‘আমি নবীজির কাছে যা শুনতাম লিখে রাখতাম। নবীজি নিজের মুখের দিকে ইশারা করে বলেছেন, তুমি লিখে রাখো; সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, এ মুখ হতে সর্বাবস্থায় সত্য ব্যতীত অন্য কিছু বের হয় না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৬)

১৫. বিদেশি ভাষা শেখার তাগিদ

আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও দাওয়াতের প্রয়োজনে নবীজি সাহাবিদের বিদেশি ভাষা শেখার নির্দেশ দেন। জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) আমাকে ইহুদিদের দাপ্তরিক ভাষা (হিব্রু ও সুরিয়ানি) অধ্যয়নের আদেশ করেন। বলেন, “আল্লাহর কসম, আমি আমার পত্রাদির ব্যাপারে ইয়াহুদিদের ওপর নিশ্চিন্ত হতে পারি না।” তারপর মাত্র অর্ধেক মাসের ব্যবধানে আমি তা আয়ত্ত করে ফেলি। এরপর থেকে তিনি ইয়াহুদিদের নিকট কোনো কিছু লিখতে চাইলে আমিই তা লিখে দিতাম। আর তারা তাঁর নিকট কোনো চিঠি পাঠালে, আমি তাঁকে তা পড়ে শোনাতাম। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭১৫)

শেষকথা

মহানবীর শিক্ষাদানের আরও অনেক পদ্ধতি ও কৌশল ছিল। গভীরভাবে সিরাত পাঠে তা প্রতিভাত হয়। ছোট পরিসরে সবটা তুলে আনা দুষ্কর। এখানে মৌলিক কিছু পদ্ধতি শুধু তুলে ধরা হলো। এগুলো শিক্ষক, অভিভাবক, দায়িত্বশীল—সবার জন্যই সামগ্রিক আদর্শ ও দিকনির্দেশক। আমাদের বর্তমান শিক্ষাগত ও নৈতিক দুর্দশা থেকে মুক্তির জন্য জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষকের এই শিক্ষাদান পদ্ধতির অনুসরণ আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।