আয়ারল্যান্ডের ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের একদল গবেষক ইতালির রোমের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে নবম শতাব্দীর একটি বইয়ের ডিজিটাল কপি ঘাঁটছিলেন। সেখানে তাঁরা এমন এক আবিষ্কার করেছেন, যা দেখে তাঁরা রীতিমতো বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন! ইতালির একটি পুরোনো লাইব্রেরির বইয়ের ভেতর লুকিয়ে ছিল ইংরেজি ভাষার সবচেয়ে পুরোনো কবিতা।
ক্যাডমন ও তাঁর স্তবগান
আজ থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ বছর আগের কথা। ইংল্যান্ডের হুইটবি নামের একটা জায়গায় থাকতেন এক সাধারণ রাখাল। তাঁর নাম ছিল ক্যাডমন। তিনি কোনো বড় কবি বা লেখক ছিলেন না। সারা দিন খামারের কাজ করেই তাঁর দিন কাটত। কিন্তু একদিন তাঁর জীবনে ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। এক রাতে তিনি একটি স্বপ্ন দেখলেন। ঘুম থেকে ওঠার পর হঠাৎ করেই তাঁর ভেতর দারুণ এক অনুপ্রেরণা চলে এল। তিনি আপন মনে একটি কবিতা রচনা করে ফেললেন। এই কবিতাকেই আজ আমরা ‘ক্যাডমন্স হিমন’ বা ‘ক্যাডমনের স্তবগান’ নামে চিনি। মাত্র ৯ লাইনের এই কবিতাই হলো ইংরেজি ভাষার সবচেয়ে পুরোনো কবিতা। এই ছোট্ট কবিতাকেই ইংরেজি সাহিত্যের সূচনা বলে ধরা হয়।
কবিতাটি কীভাবে টিকে ছিল?
ক্যাডমন নিজে কিন্তু কবিতাটি লিখে যাননি। তাহলে এটি পাওয়া গেল কীভাবে? ভেনেরাবল বিড নামে ইংল্যান্ডের এক সন্ন্যাসী ও পণ্ডিত ছিলেন। তিনি ‘একলেসিয়াস্টিক্যাল হিস্ট্রি অব দ্য ইংলিশ পিপল’ নামে একটি ইতিহাসের বই লিখেছিলেন। সেই বইয়ের বিভিন্ন কপিতে ক্যাডমনের কবিতাটির উল্লেখ ছিল। তবে সেগুলো লেখা ছিল মূলত লাতিন ভাষায়, আর প্রাচীন ইংরেজি অনুবাদটা হয়তো পরে কেউ পৃষ্ঠার এককোণে জুড়ে দিয়েছিল।
নতুন আবিষ্কার
সম্প্রতি আয়ারল্যান্ডের ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের একদল গবেষক ইতালির রোমের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে নবম শতাব্দীর একটি বইয়ের ডিজিটাল কপি ঘাঁটছিলেন। সেখানে তাঁরা যা দেখলেন, তাতে তাঁদের চোখ ছানাবড়া! তাঁরা দেখলেন, বইটির মূল লেখার ভেতরেই প্রাচীন ইংরেজিতে ক্যাডমনের সেই কবিতা লেখা আছে! এটা পরে যোগ করা হয়নি, বরং মূল লেখারই অংশ। গবেষক এলিসাবেত্তা মানিয়ান্তি বলেন, ‘আমরা রীতিমতো অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের কথা বলার ভাষা হারিয়ে গিয়েছিল! প্রথমবার দেখে আমরা নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।’
এ আবিষ্কারের খবর ‘আর্লি মেডিওভ্যাল ইংল্যান্ড অ্যান্ড ইটস নেইবারস’ নামের একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
কেন এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ?
প্রাচীন ইংরেজি ছিল আধুনিক ইংরেজির আদি রূপ, যা মধ্যযুগের শুরুর দিকে মানুষ কথা বলার জন্য ব্যবহার করত। গবেষক মার্ক ফকনার বলেন, ‘প্রাচীন ইংরেজিতে লেখা অন্য যেসব লেখা আমরা আজ পর্যন্ত পেয়েছি, সেগুলো প্রায় সবই দশম বা একাদশ শতাব্দীর। কিন্তু নবম শতাব্দীর এ বইতে পাওয়া ক্যাডমনের কবিতাটি আমাদের প্রাচীন ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। পণ্ডিত বিড তাঁর মূল বইয়ে কবিতাটি লাতিন ভাষায় লিখেছিলেন। কিন্তু এই নতুন পাণ্ডুলিপি থেকে বোঝা যায়, বিড তাঁর বই শেষ করার ১০০ বছরের মধ্যেই মূল প্রাচীন ইংরেজি কবিতাটি আবার লাতিন লেখার ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মানে, সে যুগের পাঠকেরাও ইংরেজি ভাষাকে অবহেলা করতেন না।’
কবিতাটির আধুনিক ইংরেজি ও বাংলা অনুবাদ
কবিতাটি মূলত সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা করে লেখা, যিনি মানুষের জন্য এ চমৎকার পৃথিবী তৈরি করেছেন। কবিতাটির আধুনিক ইংরেজি রূপের বাংলা উচ্চারণ ও বাংলা অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:
আধুনিক ইংরেজি:
‘Now let us praise heaven-kingdom's guardian,
The maker's might and his mind's thoughts,
The work of the glory-father—of every wonder,
Eternal Lord. He established a beginning.
He first shaped for men's sons
Heaven as a roof, the holy creator
Then middle-earth mankind's guardian,
Eternal Lord, afterwards prepared
The earth for men, the Lord Almighty.’
বাংলা অনুবাদ:
‘চলো, এখন আমরা স্বর্গরাজ্যের রক্ষাকর্তার প্রশংসা করি,
সেই স্রষ্টার শক্তি এবং তাঁর মনের ভাবনার,
মহিমান্বিত পিতার কাজ—সকল বিস্ময়ের,
অনন্ত ঈশ্বর। তিনিই একটি সূচনা করেছিলেন।
তিনি প্রথমে মানবসন্তানদের জন্য আকার দিলেন
ছাদ হিসেবে এই স্বর্গের, সেই পবিত্র স্রষ্টা
তারপর এই মধ্যপৃথিবীর, মানবজাতির রক্ষাকর্তা,
অনন্ত ঈশ্বর, এরপর প্রস্তুত করলেন
মানুষের জন্য এই পৃথিবী, সেই সর্বশক্তিমান ঈশ্বর।’
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান



