টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কালিদাস–বহুরিয়া–চতলবাইদ সড়কে কাঁকড়ার খালের ওপর নির্মাণাধীন একটি সেতুর কাজ পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি। নির্ধারিত সময়ের চার বছর পেরিয়ে গেলেও সেতুটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে মাত্র অর্ধেক। এতে ওই সড়ক ব্যবহারকারী হাজারো মানুষকে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বর্তমানে হেঁটে ও মোটরসাইকেল চলাচলের জন্য স্থানীয় লোকজনের উদ্যোগে সেতুর পাশে বাঁশের একটি অস্থায়ী মাচা তৈরি করা হয়েছে। সেই মাচার ওপর দিয়ে হচ্ছে চলাচল। কাজ অসমাপ্ত রেখে ঠিকাদার চলে যাওয়ায় নতুন করে দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নিচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
প্রকল্পের বিবরণ ও অগ্রগতি
স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলার করটিয়াপাড়া বাজারের উত্তর পাশে কাঁকড়ার খালের ওপর ২৫ মিটার দৈর্ঘ্যের পিএসসি গার্ডার সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, সরকারের ‘শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’ ও উপজেলা–ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্ত করা প্রকল্পের আওতায় ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২ কোটি ২৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৩১ টাকা ব্যয়ে কাজটি পায় মেসার্স মাইন উদ্দিনবাসী নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কার্যাদেশ অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পাঁচ বছরেও সেতুর কাজ শেষ হয়নি।
এলজিইডির কর্মকর্তারা জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রথমে প্রায় ২০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করে দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ রাখে। পরে একাধিকবার তাগাদা দেওয়ার পর কিছুদিন কাজ চালিয়ে মোট প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কাজ শেষ করে আবারও সরে যায়। সর্বশেষ ঠিকাদার অপারগতা প্রকাশ করায় আবার দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
মো. আরিফুর রহমান, উপজেলা প্রকৌশলী, বলেন: ‘ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে গেছে। এখন আবার টেন্ডার করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।’
ঠিকাদার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা
একটি সূত্রের দাবি, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি পেলেও পরে তা লিটন নামের এক বিএনপি-সংশ্লিষ্ট নেতার কাছে বিক্রি করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক মামলায় কারাবন্দী থাকায় তিনি কাজ এগিয়ে নিতে পারেননি। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর কয়েক দফা কাজ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত তিনিও কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হন।
বর্তমান পরিস্থিতি ও জনদুর্ভোগ
গত ৩১ মে সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মাণাধীন সেতুর পশ্চিম পাশে বাঁশ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী মাচা ব্যবহার করে মানুষ পারাপার হচ্ছেন। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় খালের দুই পাশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার পৃথক স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। যাত্রীদের এক পাশ থেকে নেমে হেঁটে খাল পার হয়ে অন্য পাশের যানবাহনে উঠতে হচ্ছে।
চতলবাইদ এলাকার বাসিন্দা ও দলিল লেখক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে মানুষ এই সড়ক দিয়ে যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এলাকার কৃষিপণ্য ও অন্যান্য মালামাল সহজে উপজেলা ও জেলা শহরে নেওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার ঘুরে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা খন্দকার আজিজুল হক বলেন, সখীপুর উপজেলা শহর থেকে চতলবাইদ পর্যন্ত প্রায় আট কিলোমিটার নতুন সড়কটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে নির্মিত হয়েছে। কিন্তু মাঝখানে সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় পুরো সড়কের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ট্রাক, অটোরিকশাসহ কোনো যানবাহনই চলাচল করতে পারছে না।
সেতু না থাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানান করটিয়াপাড়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার আবদুল জব্বার। তাঁর ভাষ্য, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থীরা সময়মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারে না। বহুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূরে আলম মুক্তা বলেন, এই সড়ক ব্যবহার করে ইউনিয়ন পরিষদে আসা সেবাপ্রার্থীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করা প্রয়োজন।
এলজিইডির পদক্ষেপ
এ বিষয়ে এলজিইডির সখীপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এক বছরের বেশি সময় আগে এখানে যোগদান করেছি। ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ শেষ করানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে গেছে। এখন আবার টেন্ডার করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। আশা করছি নতুন ঠিকাদার নিয়োগ হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে সেতুর অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা যাবে।’
দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এ সেতুর নির্মাণকাজ ঝুলে থাকায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। দ্রুত নতুন ঠিকাদার নিয়োগ ও কাজ সম্পন্ন না হলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।



