পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পর দলটির অভ্যন্তরীণ সংকট আরও গভীর হয়েছে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (এনডিএ) প্রতি সমর্থন জানাতে স্পিকারের কাছে আবেদন করার একদিন পর বিদ্রোহী সাংসদদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কঠোর মন্তব্য
মঙ্গলবার (৯ জুন) তৃণমূলের জ্যেষ্ঠ সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্রোহীদের পদক্ষেপকে 'বিশ্বাসঘাতকতা' হিসেবে আখ্যা দিলেও বলেন, এতে অন্তত তাদের প্রকৃত অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, 'দ্বিমুখী চরিত্রের লোকেরা চলে যাচ্ছে, এতে আমরা খুশি। যে যেতে চায়, সে যাক। আমাদের কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তারা তৃণমূল কংগ্রেস বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ব্যবহার করতে পারবে না। মানুষ সত্য জানে এবং আমাদের পাশেই আছে।'
তবে বিদ্রোহীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও কটাক্ষ করেন তিনি। তার দাবি, বিজেপি তাদের দলে নেবে না। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'অন্য কোনো দলে একীভূত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাও তাদের নেই। তাই বিজেপিও তাদের গ্রহণ করবে না।'
দলীয় সংকট ও উদ্বেগ
তবে দলের ভেতরে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাংসদের বিদ্রোহ দলীয় নেতৃত্বের ওপর প্রশ্ন তুলেছে এবং ভোটারদের কাছেও নেতিবাচক বার্তা পাঠিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তৃণমূল বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে। লোকসভার সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের ফেরাতে উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি বিদ্রোহী সাংসদদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বিদ্রোহীরা নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছেন বলে সূত্রগুলোর দাবি।
হুইপ পদে দ্বন্দ্ব
প্রায় ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ সোমবার দলীয় নেতৃত্বকে স্পষ্ট বার্তা দেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংসদীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ হুইপ পদে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে মনোনয়ন দিলেও তারা নিজেদের পছন্দে কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে প্রধান হুইপ হিসেবে বেছে নেন। এছাড়া তারা এনডিএকে সমর্থনের ইচ্ছা জানিয়ে স্পিকারের কাছেও চিঠি দিয়েছেন।
এ বিষয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'স্পিকারের সিদ্ধান্তের জন্য আমরা অপেক্ষা করব। এরপর প্রয়োজন হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।' বিদ্রোহীদের উদ্দেশে আরও কড়া ভাষায় তিনি বলেন, 'একসময় এরা তৃণমূলের হয়ে প্রচার করেছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছে। এখন তৃণমূল ক্ষমতায় নেই বলে তারা নানা অভিযোগ তুলছে। এই বিদ্রোহী সাংসদরা ক্ষমতা ছাড়া থাকতে পারে না।' তিনি বিদ্রোহীদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে ভোটারদের মুখোমুখি হওয়ারও চ্যালেঞ্জ জানান।
বিধানসভায় ভাঙনের ঝুঁকি
সংকট শুধু সংসদীয় দলে সীমাবদ্ধ নেই। বিধানসভাতেও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে তৃণমূল। দলটির ৮০ জনের বেশি বিধায়কের মধ্যে অন্তত ৬০ জন ইতোমধ্যে বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। বিদ্রোহী শিবির ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে, যদিও তৃণমূল এই পদে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে চেয়েছিল।
বিদ্রোহীদের অভিযোগ
বিদ্রোহী সাংসদ ও বিধায়কদের অভিযোগ, দলজুড়ে ব্যাপক দুর্নীতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় উপেক্ষা এবং নেতৃত্বের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণেই তারা তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর দলজুড়ে এই বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর একাধিক নেতা দলত্যাগ করেছেন। ফলে পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞ ৭১ বছর বয়সি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়েছেন।



