ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে সংসদে তীব্র বিতর্ক, সরকার-বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে সংসদে তীব্র বিতর্ক, সরকার-বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনের তৃতীয় দিন মঙ্গলবার (৯ জুন) বিকালজুড়ে উত্তপ্ত ছিল জাতীয় সংসদ। আওয়ামী লীগ আমলে সরকারি সংস্থার মাধ্যমে জোরজবরদস্তি করে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকের শেয়ার ‘দখল’ করে নেয়—এমন অভিযোগ তুলে সেই শেয়ার মূল মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানায় বিরোধী দল।

ইসলামী ব্যাংকের ‘দখল-পাল্টা দখল’ নিয়ে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়। বিরোধী দল দাবি করে, ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান বসিয়ে সরকার কার্যত এস আলম গ্রুপের পথই অনুসরণ করছে। তবে সরকার পক্ষ বলেছে, ব্যাংকে গতিশীলতা আনা এবং মূল মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের আমানত সুরক্ষার আশ্বাসও দেওয়া হয়।

বিরোধী দলের বক্তব্য

মঙ্গলবার সংসদের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান ৬৮ বিধিতে নোটিশ উত্থাপন করেন। তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ার বৈধ মালিকদের কাছে ফেরত, ব্যবস্থাপনায় সব ধরনের অনিয়ম ও হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংকের ভূমিকা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আলোচনা চান। তার নোটিশের পক্ষে তার দলের পাঁচজন সংসদ সদস্য সমর্থন জানান এবং চারজন সদস্য বক্তব্য দেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিরোধী দলের প্রধান বক্তব্যে বলা হয়, বিগত সরকারের সময়ে প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের সরিয়ে এস আলম গ্রুপের কাছে শেয়ার হস্তান্তর করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শেয়ারহোল্ডাররা ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরলেও বর্তমান সরকারের সময়ে আবার এমন ব্যক্তিদের চেয়ারম্যান ও এমডি করা হচ্ছে, যাতে এস আলম গ্রুপের পুনরায় ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকার পক্ষের বক্তব্য

সরকারি দলের পক্ষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বক্তব্য রাখেন। সরকার পক্ষের বক্তব্যে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংককে জামায়াতে ইসলামী দলীয় কাজে ব্যবহার করেছে এবং সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের আগেও ব্যাংক থেকে রাজনৈতিক কাজে অর্থায়ন করা হয়েছে।

এদিন সংসদে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা, শেয়ার হস্তান্তর, চেয়ারম্যান ও এমডি নিয়োগ ও পদত্যাগ, গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন, আন্দোলন, ঋণ বিতরণ, জামায়াতের নির্বাচনী ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক হয়। আলোচনার সময় বিরোধী দলীয় উপনেতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ইসলামী ব্যাংককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিপদে ফেলে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, কোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান পরিবর্তনের কারণে গ্রাহকরা টাকা তুলে নেয়—বিশ্বে এমন নজির নেই। গ্রাহকরা তাদের সুদ ও নিরাপত্তা বিবেচনায় রাখেন। একটি মহল ব্যাংকটিকে ফেইল করানোর চেষ্টা করছে।

তিনি আরও বলেন, বিগত নির্বাচনে নির্বাচনী এলাকায় অবিশ্বাস্য পরিমাণ টাকা খরচ হয়েছে। এমন অনেক প্রার্থী ছিলেন, যাদের আয়ের কোনো উৎস জানা নেই, অথচ তারা ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকা খরচ করেছেন। এই ‘আনআর্নড ইনকাম’ রাজনীতিতে প্রবেশ করায় তা ক্ষতিকর।

অর্থমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কিছু পায়নি। তিনি বলেন, চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনের কোনো নজির নেই। যারা টাকা তুলে নিচ্ছে, তারা ব্যাংকটিকে বিপদে ফেলতে চায়।

ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক মুনাফা নিয়ে সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত দুই বছরের প্রফিট ‘উইন্ডো ড্রেসিং’—কৃত্রিমভাবে ভালো দেখানো হয়েছে। ওই সময়ে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ক্যারি ফরওয়ার্ড করা হয়েছে।

তিনি জানান, ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণ ৯৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণ পোর্টফোলিওর ৫১ শতাংশ। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্যাংকটি ৬৯ হাজার কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ৮৪ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ডেফারেল সুবিধা নিয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকটি প্রায় ২৬৮ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, পূর্বের সরকারের সময় ইসলামী ব্যাংক দখল হওয়ার পর গ্রাহকরা টাকা তোলেননি, তাহলে এখন কেন তুলছেন—এ প্রশ্নও তিনি তোলেন। তিনি বলেন, সরকার ব্যাংকটিকে তার বৈধ মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করছে।

দেশে ‘মবোক্রেসি’ বা উচ্ছৃঙ্খলতার প্রবণতা বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ভূমিকার প্রশংসা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, তিনি আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে সাহসিকতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

বিএনপি সবসময় আর্থিক শৃঙ্খলায় বিশ্বাস করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অতীতের বিএনপি সরকারের সময় ম্যাক্রো ইকোনমিক স্থিতিশীলতা সবচেয়ে ভালো ছিল। ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ বিএনপির হাতে শতভাগ নিরাপদ বলেও তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন।

বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্য

এর আগে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ২০১৬ সালে ইসলামী ব্যাংক ৪৪৭ কোটি টাকার বেশি মুনাফা অর্জন করে এবং তখন খেলাপি বিনিয়োগের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। পরবর্তীতে ‘ফ্যাসিবাদী সরকার’ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লুটপাট ও অনিয়মের মাধ্যমে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করে—এমন অভিযোগ তিনি করেন।

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায় এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়া সম্ভব হয়নি। খেলাপি বিনিয়োগ ৫১ শতাংশে পৌঁছায়। পরবর্তীতে ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও আবারও পুরোনো ‘দখলকারী চক্র’ সক্রিয় হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, নতুনভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিদের চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়েছে এবং এমডিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তিনি বলেন, একদিনে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আমানত উত্তোলন করা হয়েছে, যা আস্থার সংকটের প্রতিফলন।

তিনি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান এবং প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিরোধী দল যে ন্যায়নীতির পথে ফেরার কথা বলছে, সেই প্রক্রিয়াই বাংলাদেশ ব্যাংক বাস্তবায়ন করবে। বৈধ শেয়ারহোল্ডারদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়’—এ ধরনের বক্তব্য ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ব্যাংক থেকে অর্থায়ন ও রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়েও।

তিনি বলেন, যারা পর্দার আড়াল থেকে গ্রাহক পরিচয়ে আন্দোলন করছে, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় খতিয়ে দেখা উচিত।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, ইসলামী ব্যাংকের আরডিএস প্রকল্পে পল্লী উন্নয়নের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া হয়। ভোটের আগে কিছু অর্থ বিতরণের অভিযোগও তিনি তোলেন।

তিনি বলেন, নাবিল গ্রুপকে ৭০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল, যা ফেরত আসেনি। সিএসআর তহবিল, নিয়োগ ও অর্থ স্থানান্তর নিয়েও তদন্তের দাবি জানান তিনি।

অন্যান্য সাংসদের বক্তব্য

বিরোধী দলীয় উপনেতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ইসলামী ব্যাংকের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে সারা দেশে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

ঢাকা-১২ আসনের সাংসদ সাইফুল আলম বলেন, ২৪টি অ-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠান আমানত ফেরত দিতে পারছে না, যা আস্থাহীনতার প্রমাণ। তিনি এস আলম গ্রুপকে বড় ঋণ খেলাপি হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংক এস আলম গ্রুপের হাতে যাওয়ার ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে এবং ডলারের দর ৮৪ টাকা থেকে ১২৬ টাকায় পৌঁছেছে।

জামায়াতের সংরক্ষিত আসনের সাংসদ মারিয়া মমতাজ বলেন, এমডিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে এবং গভর্নরের পরিবারের সঙ্গে বিরোধের বিষয়ও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি দেশের অর্থনীতির জন্য পরিস্থিতিকে ‘অবমাননাকর’ বলে মন্তব্য করেন।