বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন: নৈতিক সংকট ও নতুন জাতীয়তাবাদের চ্যালেঞ্জ
বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন: নৈতিক সংকট ও চ্যালেঞ্জ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ১০০ দিন অতিক্রম করেছে। যেকোনো নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিন সাধারণত তার রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, শাসনদর্শন, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সংস্কার-রূপরেখা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই ১০০ দিনের তাৎপর্য আরও গভীর। কারণ, এই সরকারের সামনে কেবল দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা বা উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব নেই, এর সামনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অপশাসন, দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং নৈতিক স্খলনের সংস্কৃতি থেকে রাষ্ট্র ও সমাজকে বের করে আনার কঠিন ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

নৈতিক সংকটের গভীরতা

বাংলাদেশ আজ যে সংকটে দাঁড়িয়ে আছে, তা শুধু অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক নয়; এর চেয়েও গভীর সংকট হলো নৈতিকতা, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং জাতীয় স্বার্থবোধের সংকট। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক আচরণ এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে সমাজের একটি বড় অংশ এখন অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে দেখার নৈতিক শক্তিও হারাতে বসেছে। সততা ও নিষ্ঠা যেখানে একসময় সামাজিক মর্যাদার বিষয় ছিল, সেখানে এখন অনেক ক্ষেত্রেই তা দুর্বলতা বা বোকামি হিসেবে বিবেচিত হয়। বিপরীতে অর্থ, প্রভাব ও ক্ষমতাই হয়ে উঠেছে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রধান মানদণ্ড। অর্থের উৎস বৈধ না অবৈধ, নৈতিক না অনৈতিক, তা নিয়ে সামাজিক অস্বস্তি ক্রমেই কমে গেছে।

এই বাস্তবতা এক দিনে তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, বিচারহীনতা, প্রশাসনিক দলীয়করণ এবং দুর্নীতির সামাজিকীকরণ আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজকে ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় নিয়ে এসেছে, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থকে জাতীয় স্বার্থের ওপরে স্থান দেওয়া প্রায় স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়েছে। একজন ব্যক্তি দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হলেও সমাজ অনেক সময় তাকে প্রশ্ন না করে তার ‘সাফল্য’ উদ্‌যাপন করে। ক্ষমতার অপব্যবহারকে কৌশল, অনিয়মকে সুযোগ এবং নীরবতাকে বাস্তববাদ হিসেবে গ্রহণ করার এই প্রবণতাই রাষ্ট্রগঠনের সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকেত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের তাৎপর্য

এই প্রেক্ষাপটে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটি নিছক রাজনৈতিক বাক্য নয়; এটি হতে পারে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি শক্তিশালী নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি। কিন্তু কোনো স্লোগান নিজে নিজে সমাজ বদলায় না। স্লোগান তখনই কার্যকর হয়, যখন তা নীতি, প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, দলীয় সংস্কৃতি এবং নাগরিক আচরণের অংশে পরিণত হয়। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ যদি শুধু জনসভায় উচ্চারিত হয়, পোস্টারে ছাপা হয় বা নির্বাচনী ভাষণে ব্যবহৃত হয়, তবে তার কোনো ঐতিহাসিক তাৎপর্য থাকবে না। এটিকে মানুষের মননে, প্রশাসনের নীতিতে এবং রাজনৈতিক কর্মীদের চরিত্রে প্রতিফলিত করতে পারলেই এটি নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রনৈতিক দর্শনে পরিণত হতে পারে।

বিএনপির চ্যালেঞ্জ

এখানেই তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, দীর্ঘদিনের অন্যায়, অপশাসন ও দুর্নীতির সংস্কৃতি থেকে শুধু প্রশাসনকে নয়, দলীয় নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষকেও বের করে আনতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো মানুষের মনন সংস্কার। শেষ পর্যন্ত বিএনপির সামনে প্রশ্নটি সরল, কিন্তু উত্তরটি অত্যন্ত কঠিন। দলটি কি ক্ষমতার দল থেকে আদর্শের দলে রূপান্তরিত হতে পারবে? তারা কি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে নতুন যুগের উপযোগী, অন্তর্ভুক্তিমূলক, নৈতিক ও রাষ্ট্রগঠনমূলক দর্শনে পরিণত করতে পারবে? তারা কি এমন কর্মী ও নেতৃত্ব তৈরি করতে পারবে, যারা ব্যক্তিস্বার্থের ওপরে জাতীয় স্বার্থকে স্থান দেবে?

প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে অফিস বদলানো যায়, আইন করে প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করা যায়, কিন্তু মানুষের ভেতরের নৈতিক শূন্যতা দূর করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিএনপি যদি এই জায়গায় সফল না হয়, তাহলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবে গভীর পরিবর্তন আনতে পারবে না।

বিএনপির ঐতিহাসিক পটভূমি

বিএনপির ইতিহাস এ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। দল হিসেবে বিএনপির জন্ম হয়েছিল অস্থির ও অনিশ্চিত এক সময়ে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তখন যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন, প্রশাসনিক দুর্বলতা, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, একদলীয় শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সামরিক অভ্যুত্থান এবং জনমানসে গভীর অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এমন প্রেক্ষাপটে জাতীয় ঐক্য, স্থিতিশীলতা, শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিএনপির আবির্ভাব ঘটে। ফলে বিএনপি শুরু থেকেই শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবেও নিজেকে উপস্থাপন করে।

প্রতিষ্ঠার পর বিএনপির রাজনীতি কয়েকটি বড় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। প্রথমত, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা। এই ধারণা ভাষা, ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, স্বাধীনতা, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজবাস্তবতা এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে একত্রে ধারণ করার চেষ্টা করে। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগবিরোধী এবং ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একটি বৃহত্তর ছাতার নিচে আনার চেষ্টা বিএনপিকে দ্রুত জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত করে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি বিএনপিকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

তবে বিএনপির ঐতিহাসিক সাফল্যের ভেতরেই একটি মৌলিক দুর্বলতা ছিল। দলটি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভাষা ব্যবহার করলেও সেটিকে কখনো পূর্ণাঙ্গ, প্রাতিষ্ঠানিক ও ধারাবাহিক মতাদর্শিক কাঠামোয় রূপ দিতে পারেনি। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে একটি মধ্য ডানপন্থী, ক্ষমতাকেন্দ্রিক, নির্বাচনী এবং বিস্তৃত প্ল্যাটফর্মভিত্তিক দল হিসেবে কাজ করেছে; কিন্তু আদর্শিক কর্মী তৈরির ক্ষেত্রে তার বিনিয়োগ ছিল সীমিত। ফলে দলটি জনসমর্থন পেয়েছে, কিন্তু প্রজন্মভিত্তিক আদর্শিক চরিত্র নির্মাণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। ক্ষমতার রাজনীতি শক্তিশালী হয়েছে, কিন্তু আদর্শের রাজনীতি দুর্বল থেকেছে।

পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা

৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্য ভেঙে যাওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পরিসর নতুনভাবে বিন্যস্ত হচ্ছে। আগে বিএনপির যে রাজনৈতিক ক্ষেত্র প্রায় একক ছিল, এখন সেখানে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী নিজেদের ঐতিহ্যগত ধর্মভিত্তিক অবস্থানকে কিছুটা পুনর্গঠন করে মধ্য ডানপন্থী, তুলনামূলকভাবে লিবারেল এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক দল হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তি এনসিপিও তরুণ নেতৃত্ব, রাষ্ট্র সংস্কার, জাতীয় মর্যাদা, দুর্নীতিবিরোধিতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সামনে এনে নিজেদের রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বিএনপির পুরোনো রাজনৈতিক ভাষা আর যথেষ্ট নয়। আওয়ামী লীগবিরোধিতা, ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী অবস্থান, লিবারেল ইসলামি সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বয়ান এখন একাধিক রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করছে। ফলে বিএনপিকে এখন শুধু প্রতিপক্ষবিরোধী রাজনীতি নয়, ইতিবাচক আদর্শভিত্তিক রাজনীতি নির্মাণ করতে হবে। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সরাসরি বিরোধী রাজনীতির ভাষা ব্যবহার করা কঠিন। আবার জামায়াতের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ বা যুদ্ধাপরাধের প্রশ্ন তুলে পুরোনো রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা অনেক সময় আওয়ামী লীগের পুরোনো বয়ানের পুনরুৎপাদন হিসেবে দেখা হতে পারে। ফলে বিএনপির সামনে আসল প্রশ্ন হলো, তারা কি নতুন যুগের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নির্মাণ করতে পারবে?

নতুন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নির্মাণ

এই নতুন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কেবল পরিচয়ভিত্তিক আবেগ দিয়ে তৈরি করা যাবে না। এটিকে হতে হবে নৈতিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, উন্নয়নমুখী এবং রাষ্ট্রনৈতিক। এর কেন্দ্রে থাকতে হবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, নাগরিক সমতা, দুর্নীতিবিরোধী নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ। এটি এমন এক জাতীয়তাবাদ হতে হবে, যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে সম্মান করবে, কিন্তু একই সঙ্গে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, আদিবাসীসহ সব নাগরিকের সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এটি এমন এক জাতীয়তাবাদ হবে, যেখানে ধর্ম সামাজিক নৈতিকতার শক্তি হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র হবে সব নাগরিকের নিরাপদ আশ্রয়।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের এই নতুন পাঠে ‘দেশ’ মানে শুধু মানচিত্র নয়; দেশ মানে মানুষ, নদী, মাটি, প্রতিষ্ঠান, ইতিহাস, সংস্কৃতি, নাগরিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার। দেশপ্রেম মানে শুধু আবেগ নয়; এটি দায়িত্ব। কর দেওয়া, আইন মানা, দুর্নীতির বিরোধিতা করা, জনসম্পদ রক্ষা করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের ওপরে রাখা, এসবই দেশপ্রেমের অংশ। এই জায়গাতেই ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ধারণাকে নতুন রাজনৈতিক দর্শনে রূপ দেওয়া সম্ভব।

সংস্কারের পথ

কিন্তু এই রূপান্তর দলীয় স্লোগান দিয়ে হবে না। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থায় নাগরিক শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা এবং রাষ্ট্র চেতনার উপাদানকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুধু পরীক্ষাভিত্তিক জ্ঞান নয়, দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। বিতর্ক, পাঠচক্র, রচনা প্রতিযোগিতা, চিত্রাঙ্কন, নাটক, শর্টফিল্ম, স্থানীয় ইতিহাসচর্চা, সংবিধান পাঠ, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, পরিবেশ সচেতনতা এবং দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষা শিশু-কিশোরদের মননে নৈতিকতা ও দেশচেতনা গড়ে তুলতে পারে। তবে এটি কোনো দলীয় প্রচারণা হওয়া উচিত নয়; এটি হতে হবে রাষ্ট্রীয় নাগরিক শিক্ষা, যার মূল লক্ষ্য ভালো মানুষ, সুনাগরিক এবং দায়িত্বশীল প্রজন্ম তৈরি করা।

দ্বিতীয়ত, বিএনপিকে নিজের ভেতর থেকেই সংস্কার শুরু করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল যদি রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি করে, তাহলে সেই দলের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি হতে হবে নৈতিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। নেতা-কর্মীদের কার্যকর তালিকা, তাঁদের রাজনৈতিক অতীত, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, অভিযোগের ইতিহাস, জনসম্পৃক্ততা এবং সাংগঠনিক অবদান মূল্যায়নের একটি কাঠামো তৈরি করা জরুরি। যে কেউ ক্ষমতার সুযোগে দলের নামে চাঁদাবাজি, দখল, অন্যায় বা দুর্নীতি করলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। ক্ষমতার সময় দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করা বিরোধী দলের সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্ষমতার সময়ই রাজনৈতিক চরিত্রের প্রকৃত পরীক্ষা হয়।

তৃতীয়ত, বিএনপিকে আদর্শিক কর্মী তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিক দল শুধু সমর্থক দিয়ে টিকে থাকে না; দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকে কর্মী, চিন্তা এবং মূল্যবোধ দিয়ে। সুবিধাভোগী কর্মী ক্ষমতার সঙ্গে আসে এবং ক্ষমতার সঙ্গে চলে যায়। কিন্তু আদর্শিক কর্মী দলকে সংকটে ধরে রাখে, সমাজে চিন্তার বিস্তার ঘটায় এবং রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। বিএনপির ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলোকে শুধু মিছিল, স্লোগান ও প্রতিপক্ষবিরোধী অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পাঠচক্র, নীতি আলোচনা, গবেষণা, সমাজসেবা, স্থানীয় সমস্যা সমাধান, পরিবেশ রক্ষা এবং দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগে যুক্ত করতে হবে।

চতুর্থত, দলীয় পদ-পদবি প্রদানের ক্ষেত্রে আনুগত্যের চেয়ে সততা, দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা এবং প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নিয়মিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, সংবিধান, রাষ্ট্রচিন্তা, গণতান্ত্রিক আচরণ, নৈতিকতা, গণমাধ্যম ব্যবহার, বক্তব্য প্রদান, জনসেবা এবং দলীয় শৃঙ্খলা বিষয়ে প্রস্তুত করতে হবে। এসব প্রশিক্ষণ গণহারে আনুষ্ঠানিকভাবে না করে ছোট ছোট দলে, আলোচনাভিত্তিক পদ্ধতিতে করা উচিত, যাতে তা বাস্তবিকভাবে কার্যকর হয়।

উপসংহার

বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন তাই একটি সতর্কবার্তাও বটে। জনগণ এখনো অপেক্ষা করছে একটি নৈতিকভাবে দৃঢ়, প্রশাসনিকভাবে কার্যকর এবং রাজনৈতিকভাবে পরিণত রাষ্ট্র পরিচালনার মডেল দেখার জন্য। এই সময়ের মধ্যে কিছু নীতি, অগ্রাধিকার ও উদ্যোগ দৃশ্যমান হলেও সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখনো সামনে। সরকার কি ক্ষমতার সংস্কৃতিকে জনসেবার সংস্কৃতিতে রূপ দিতে পারবে? দলীয় কর্মীদের কি সুবিধাভোগী চরিত্র থেকে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক কর্মীতে রূপান্তর করতে পারবে? প্রশাসনকে কি ভয়, আনুগত্য ও লেনদেনের সংস্কৃতি থেকে বের করে ন্যায়, দক্ষতা ও জবাবদিহির পথে আনতে পারবে?

শেষ পর্যন্ত বিএনপির সামনে প্রশ্নটি সরল, কিন্তু উত্তরটি অত্যন্ত কঠিন। দলটি কি ক্ষমতার দল থেকে আদর্শের দলে রূপান্তরিত হতে পারবে? তারা কি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে নতুন যুগের উপযোগী, অন্তর্ভুক্তিমূলক, নৈতিক ও রাষ্ট্রগঠনমূলক দর্শনে পরিণত করতে পারবে? তারা কি এমন কর্মী ও নেতৃত্ব তৈরি করতে পারবে, যারা ব্যক্তিস্বার্থের ওপরে জাতীয় স্বার্থকে স্থান দেবে? তারা কি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’কে শুধু স্লোগান নয়, আচরণ, নীতি ও প্রতিষ্ঠানগত সংস্কৃতিতে রূপ দিতে পারবে? যদি পারে, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।

মো. অহিদুজ্জামান শিক্ষক, গ্লোবাল স্টাডিজ ও গভর্ন্যান্স বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ।