নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত শনিবার রাতে একটি পোস্ট দেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন। বিশ্লেষক, রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করছেন, তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে দৃষ্টি ফেরাতে এই কৌশল নিচ্ছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, বিতর্কিত অধ্যাদেশ, উচ্ছেদ হওয়া ভূমিহীনদের চলমান দুর্দশা এবং বার্ষিক বাজেটে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অবহেলা করার কারণে সরকার যখন তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ছে, তখন প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল কর্মকাণ্ড জনগণের শক্তিকে সস্তা অনলাইন বিতর্কের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
রহস্যময় পোস্ট ও প্রতিক্রিয়া
সর্বশেষ বিতর্কের সূত্রপাত গত শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে, যখন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ তাঁর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে একটি রহস্যময় পোস্ট দেন। তিনি লেখেন, ‘আমিও রাষ্ট্রদূত হতে চাই। কারও কাছে প্রধানমন্ত্রীর নম্বর থাকলে দয়া করে শেয়ার করবেন কি?’ পোস্টটি দ্রুতই উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে হালকা ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া পেতে শুরু করে, যা রাষ্ট্রীয় বিষয়কে খাটো করে দেখার কারণে জনগণের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।
মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের মন্তব্য
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অসীম শাহ হাসির ইমোজি দিয়ে পোস্টে মন্তব্য করেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলে দেব।’ শিক্ষামন্ত্রী ও সরকারের মুখপাত্র সস্মিত পোখারেল উত্তর দেন, ‘আমি কি তাঁকে মেসেজ করব?’ একইভাবে, সংসদ সদস্য টিকা সাংগ্রৌলা লেখেন, ‘আমার কাছে আছে; কিন্তু আপনাকে দেব না।’ তরুণ নেত্রী রঞ্জু দর্শনা মন্তব্য করেন, ‘একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত হওয়া যায় না। আগে যেকোনো একটা বেছে নিন।’
সমর্থক ও সমালোচকদের মতামত
প্রধানমন্ত্রীর সমর্থকেরা এ কর্মকাণ্ডকে সাধারণ ডিজিটাল সম্পৃক্ততা বলে রক্ষা করার চেষ্টা করলেও সমাজের একটি বড় অংশ নির্বাহী পদের এমন অবমূল্যায়নে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সমালোচকদের যুক্তি, প্রধানমন্ত্রী সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার সংস্কৃতিকে কাজে লাগাচ্ছেন, যা মূলত কেবল জনমনে বিতর্ক তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি কৌশল।
জেন-জি নেত্রীর প্রতিক্রিয়া
জেন–জি নেত্রী তনুজা পান্ডে কান্তিপুরকে বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি প্রবণতা লক্ষ করছি, যেখানে রাষ্ট্রীয় বিষয় ও ব্যক্তিগত বিনোদনের মধ্যকার পার্থক্য সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে নেপালের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য কূটনৈতিক নির্বাচন করা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সাংবিধানিক বিষয়। এটি তাঁর ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় এবং এই দুটির পার্থক্য বুঝতে না পারাটা সত্যিই দুঃখজনক।’
পূর্বের ঘটনা ও প্রসঙ্গ
এই অনলাইন–কাণ্ডের ঠিক আগেই ৪ জুন একটি বহুল আলোচিত ঘটনাটি ঘটে, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদের সরাসরি নির্দেশে সচিব কৃষ্ণ হরি পুষ্করকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রধানমন্ত্রী শাহকে সরাসরি ব্যক্তিগত বার্তা পাঠিয়ে প্রশাসনিক নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে পুষ্করকে আটক করা হয়। সাবেক জ্যেষ্ঠ আমলারা উল্লেখ করেছেন, একটি ইলেকট্রনিক বার্তার জন্য একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে আটক করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করা একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করে। তাঁদের মতে, এটি প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত এবং আমলাতন্ত্রের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করবে।
মানবাধিকারকর্মীর বক্তব্য
মানবাধিকারকর্মী মজিদ আনসারি বলেন, পুলিশকে আইনের শাসন অনুযায়ী চলতে হবে, প্রধানমন্ত্রীর মেজাজ-মর্জির ওপর ভিত্তি করে নয়। শাহ প্রশাসনের জন্য এ ধরনের আচরণ নতুন নয়। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, নীতিগত ব্যর্থতা এবং আইনি বিতর্কগুলোকে আড়াল করতে প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব নাটকীয়তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
সাংবিধানিক সংকট ও বিতর্ক
গত ২৭ এপ্রিল সাংবিধানিক পরিষদ এবং সমবায় জালিয়াতি ব্যবস্থাপনা–সম্পর্কিত বিতর্কিত অধ্যাদেশগুলো পাস করার জন্য সংসদকে এড়াতে মন্ত্রিসভা আকস্মিকভাবে ফেডারেল সংসদের অধিবেশন স্থগিত করে, যার সুপারিশ শাহ নিজেই প্রেসিডেন্টের কাছে করেছিলেন। সংসদীয় নজরদারি এড়ানোর এ ঘটনায় যখন জনক্ষোভ বাড়ছিল, তখন ৯ মে শাহ ফেসবুকে নিজের একটি কায়দা করে তোলা ছবি পোস্ট করেন। ছবিটি ভাইরাল হয়ে যায় এবং সামাজিক মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি এর অসংখ্য প্রতিলিপি তৈরি হতে থাকে। ফলে আইনসভার সংকটটি দ্রুতই প্রধানমন্ত্রীর ছবি নিয়ে আলোচনার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।



