শাহজালালে বজ্রপাতে বিমানের ক্ষতি, এয়ারলাইন্সের কোটি কোটি টাকা লোকসান
শাহজালালে বজ্রপাতে বিমানের ক্ষতি, এয়ারলাইন্সের কোটি টাকা লোকসান

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আকাশসীমায় ধারাবাহিক বজ্রপাতের ঘটনায় উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত বিমানগুলোর মেরামত, যন্ত্রাংশ আমদানি এবং আন্তর্জাতিক রুটে বিমান বসে থাকার কারণে ক্ষতির পরিমাণ লাখ লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

ক্ষতিগ্রস্ত বিমানের তালিকায় ইজিপ্ট এয়ারের ড্রিমলাইনার

সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আকাশসীমায় বজ্রপাতের কবলে পড়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী অন্তত তিনটি অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বশেষ এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে ইজিপ্ট এয়ারের একটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার।একের পর এক উড়োজাহাজ এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ‘এওজি’ (এয়ারক্রাফট অন গ্রাউন্ড) বা উড্ডয়নের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সূচি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোকে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় পড়তে হয়েছে।

বেবিচকের বক্তব্য

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমোডর নূর-ই-আলম বলেন, বিমানবন্দরের চারপাশে বজ্রপাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে। রানওয়ে বা পার্কিং বেতে থাকা অবস্থায় বিমান বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ঘটেছে আকাশে অবতরণের সময়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিমান বাংলাদেশের ক্ষতি

জানা গেছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৮৭-৮ উড়োজাহাজ অবতরণের সময় বজ্রপাতের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে এর একটি ইঞ্জিনের ক্ষতি হয়। পরে মেরামতের পর ৬ জুন সেটি আবার চলাচলের উপযোগী করা হয়।এর আগে গত ২৬ মে রাতে একই ধরনের আরেকটি ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আরেকটি বোয়িং ৭৮৭-৮ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ১৫ দিন মেরামত কাজ চালিয়ে প্রায় ৩ লাখ ডলার ব্যয়ে সেটিকে সচল করা হয়।সর্বশেষ রবিবার (৭ জুন) বজ্রপাতের আঘাত হানে ইজিপ্ট এয়ারের একটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনারে।

কেন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আধুনিক বিমান

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, কালবৈশাখী ও বর্ষা মৌসুমে মেঘের পারস্পরিক ঘর্ষণে বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি হয়। বিমান যখন এসব চার্জযুক্ত মেঘের ভেতর দিয়ে উড্ডয়ন বা অবতরণ করে, তখন তা বিদ্যুৎ পরিবাহকের মতো আচরণ করে।পুরোনো উড়োজাহাজের বডি মূলত অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি হওয়ায় বজ্রপাতের বিদ্যুৎ সহজেই পুরো কাঠামোতে ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের মতো আধুনিক বিমানের প্রায় ৫০ শতাংশ অংশ তৈরি কম্পোজিট বা কার্বন ফাইবার উপাদানে, যা অ্যালুমিনিয়ামের মতো দক্ষভাবে বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে না।ফলে বজ্রপাতের তীব্র বৈদ্যুতিক প্রবাহ থেকে উৎপন্ন তাপ কম্পোজিট স্তরে ক্ষতি সৃষ্টি করে। এতে বডিতে কালো দাগ, ছোট-বড় গর্ত এবং অভ্যন্তরীণ স্তর বিচ্ছিন্ন হওয়ার (ডিল্যামিনেশন) মতো জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ইজিপ্ট এয়ারের বিমানের ক্ষতির বিবরণ

প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, ইজিপ্ট এয়ারের ক্ষতিগ্রস্ত উড়োজাহাজে বজ্রপাতের প্রবেশ ও বহির্গমন চিহ্ন পাওয়া গেছে। তীব্র বিদ্যুৎ প্রবাহের কারণে বিমানের বডিতে কালো দাগ এবং বিভিন্ন স্থানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।

নিরাপত্তার কারণে উড্ডয়ন স্থগিত

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রকৌশলীরা ক্ষতিগ্রস্ত বিমানগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে ‘এওজি’ ঘোষণা করে সাময়িকভাবে উড্ডয়ন বন্ধ করেছেন।তাদের মতে, বাইরে থেকে ক্ষতি সামান্য মনে হলেও বজ্রপাতের প্রভাবে বিমানের অভ্যন্তরীণ ওয়্যারিং, এভিওনিকস, ইলেকট্রনিক বোর্ড কিংবা জ্বালানি ব্যবস্থায় গুরুতর ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া বডির ক্ষুদ্র ফাটল উচ্চ আকাশে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণও হতে পারে।বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক এয়ার কমোডর মঞ্জুর-ই-আলম বলেন, উড়োজাহাজে বজ্রপাত প্রতিরোধে নিজস্ব ব্যবস্থা থাকে এবং এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাইলটদের বিশেষ নির্দেশনাও দেওয়া থাকে। তবে আকাশে বজ্রপাতের মুখে পড়লে তা সম্পূর্ণ এড়ানো সবসময় সম্ভব হয় না।

মেরামতে লাগতে পারে লাখ লাখ ডলার

বিশেষজ্ঞদের মতে, কম্পোজিট বডির ক্ষতি নির্ণয়ে অত্যাধুনিক ‘নন-ডেস্ট্রাকটিভ টেস্টিং’ বা আল্ট্রাসনিক পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। ক্ষতির মাত্রা নিশ্চিত হওয়ার পর প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী মেরামত করতে হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।গত ১৫ দিনে তিনটি উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গ্রাউন্ডেড থাকায় মেরামত ব্যয়, যন্ত্রাংশ আমদানি এবং ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বজনিত ক্ষতি মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোর লোকসানের পরিমাণ কয়েক লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

সমাধান কী

বিমানের সাবেক প্রকৌশলী আবু সুফিয়ান বলেন, বজ্রপাতের ক্ষতি কমাতে আধুনিক উড়োজাহাজে কপার বা অ্যালুমিনিয়াম মেশ, স্ট্যাটিক ডিসচার্জ উইকস, উন্নত থ্রিডি ওয়েদার রাডার, স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সেন্সর এবং লেজার আল্ট্রাসনিক টেস্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।তার মতে, বজ্রপাত পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও আধুনিক সুরক্ষা প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।