বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশে দীর্ঘদিন ধরে লাইসেন্সিং জটিলতা, অস্বচ্ছ কর কাঠামো ও প্রশাসনিক বিলম্ব বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই কাঠামো ব্যবসার 'লুকানো খরচ' বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং দেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে ব্যাহত করেছিল। প্রস্তাবিত FY27 জাতীয় বাজেট এই বাধাগুলি দূর করতে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
দ্রুত অনুমোদন ও দীর্ঘমেয়াদী লাইসেন্স
নতুন বাজেটে কারখানা স্থাপনের জন্য বর্তমান ধীরগতির প্রক্রিয়ার পরিবর্তে একটি দ্রুত ট্র্যাক ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা আবেদনের সাত কার্যদিবসের মধ্যে অস্থায়ী বা প্রাথমিক অনুমোদন পাবেন। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দেওয়া হয়, তবে লাইসেন্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে 'ডিমড অ্যাপ্রুভাল' পদ্ধতিতে বৈধ বলে গণ্য হবে। এছাড়া, বাণিজ্যিক লাইসেন্স ও পারমিটের মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়ানো হবে, যা বার্ষিক নবায়নের ঝামেলা কমাবে।
বাংলাবিজ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম
একাধিক সরকারি অফিসে ঘোরাঘুরির পরিবর্তে 'বাংলাবিজ' নামে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হবে। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য একক আবেদনের মাধ্যমে সব ধরনের নিয়ন্ত্রক ছাড়পত্র প্রক্রিয়াকরণের সুবিধা দেবে, যা দুর্নীতি কমিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
স্বয়ংক্রিয় কর ব্যবস্থা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ অনলাইন ও স্বয়ংক্রিয় কর জমা ব্যবস্থা চালু করবে, যার সাথে মোবাইল অ্যাপ থাকবে। এই ডিজিটাল কর ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময়সীমা তুলে দিয়ে বছরের যেকোনো সময় কর জমা দেওয়া যাবে। সময়মতো কর জমা দিলে আর্থিক সুবিধা, বিলম্বে জরিমানা, সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রিফান্ড এবং কাস্টমস ও আয়কর ডেটার সমন্বয়ের মাধ্যমে হয়রানি কমানোর ব্যবস্থা থাকবে।
করের হার হ্রাস
সরকার কমপক্ষে ১৯টি কৌশলগত শিল্পে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও উৎসে কর (টিডিএস) কমানোর পরিকল্পনা করছে। উপকৃত খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্প কাঁচামাল, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, মোবাইল উৎপাদন, রপ্তানি, প্যাকেজিং, পরিবহন, মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর, পুনর্ব্যবহার, স্বর্ণ ও জুয়েলারি, এবং বিদেশি বিমা প্রিমিয়াম।
স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা
দেশের ৫০ হাজার স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে কর জালে আনতে টার্নওভার ট্যাক্স ১% থেকে কমিয়ে ০.৫০% করা হবে এবং স্বর্ণ বিক্রয়ে ১৫% মূলধন লাভ কর চালু হবে। ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল কন্টেন্ট নির্মাতাদের বিদেশি রেমিট্যান্সে ১০০% কর ছাড় বহাল থাকবে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) করমুক্ত টার্নওভার সীমা ৫০ লাখ টাকা এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৭০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রযুক্তি স্টার্টআপগুলি ৯ বছরের কর অবকাশ পাবে এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে উৎপাদন স্থাপনে অতিরিক্ত কর সুবিধা দেওয়া হবে।
সবুজ শক্তিতে ছাড়
সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও শিল্প ব্যাটারিতে শুল্ক কমানো হবে এবং সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে কর ছাড় দেওয়া হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ ২০৩৫ সাল পর্যন্ত কর সুবিধা পাবে। বৈদ্যুতিক গাড়ির আমদানি শুল্ক কমানো হবে এবং ইভি চার্জিং নেটওয়ার্ক স্থাপনে কর ছাড় দেওয়া হবে।
কর বিরোধ নিষ্পত্তিতে সময়সীমা
আপিল, ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে (এডিআর) কর বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে। এটি কর্পোরেট নগদ প্রবাহ সুরক্ষিত করবে এবং রাজস্ব আয়ের পূর্বাভাসযোগ্যতা নিশ্চিত করবে।



