চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সরকারের তিন লাখ শতক (৩১শ একর) খাসজমির মধ্যে প্রায় দুই লাখ শতক ভূমি অফিসের রেকর্ডপত্র থেকে উধাও হয়ে গেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের সঙ্গে ভূমি ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এসব জমি জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি ও নামজারি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই জমি ব্যাপকভাবে লুট হয়েছে। দখলদারদের তালিকায় আছেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এবং তার পরিবারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘চৌধুরী অ্যাগ্রো’। কয়েক হাজার কোটি টাকার এই বিশাল খাসজমি লুটের মহোৎসবে রাজনৈতিক নেতা থেকে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরাও অংশ নেন।
পাহাড় কেটে জমি লুট
ভূমিদস্যুরা প্রথমে পাহাড়ের গাছ কেটে ফেলে। এরপর পাহাড় কেটে মাটি ও বালু সরিয়ে প্লট আকারে বিক্রি করে। তাদের এই ধ্বংসযজ্ঞে ৭০ ভাগ পাহাড়-টিলা উজাড় হয়ে গেছে। একসময় যেখানে ৪-৫ কিলোমিটার বিস্তৃত পাহাড় ও টিলার সারি ছিল, সেটি এখন দীর্ঘ খালে পরিণত হয়েছে। এমনকি পাহাড় কাটার মাটি ও বালু সরাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম গ্যাস সঞ্চালন লাইনের ওপর দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। এতে যেকোনো সময় গ্যাসলাইনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রেকর্ডে নেই অর্ধেকের বেশি জমি
যুগান্তরের মাসব্যাপী অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের রেকর্ডে জঙ্গল সলিমপুরে ৩ লাখ ১০ হাজার শতক খাসজমি থাকলেও সীতাকুণ্ড সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে রয়েছে মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৮১ শতকের তথ্য। বাকি ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৯১ শতক জমি রেকর্ডবহির্ভূত। সীতাকুণ্ড রেজিস্ট্রি অফিসে জালিয়াতির মাধ্যমে জমি বিক্রি ও নামজারি করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ওই অফিসের এক দলিল লেখক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, ইয়াসিনকে মালিক সাজিয়ে জমি বিক্রি ও নামজারি করা হয়েছে। রেকর্ডপত্র থেকে খাসজমির তালিকা গোপন করে রেজিস্ট্রি ও নামজারি করা হয়। অফিসের অনেক কর্মচারী ইয়াসিনের সহযোগী।
উদ্ধারে ব্যর্থ সরকারি উদ্যোগ
২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মাস্টারপ্ল্যান সভায় খাসজমি উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ব্যর্থ হয়েছে। সভায় বলা হয়, ২০১৭ সালে প্রথম উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়, কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কারণে তা সফল হয়নি। বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুরের জমি চট্টগ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে সয়লাব। দখলের তালিকায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের পাশাপাশি চট্টগ্রাম ব্রিকস অ্যান্ড ক্লে ওয়ার্কস, পোর্টলিংক লজিস্টিকস, খান অ্যাগ্রো, সলিমপুর সিডিএ আবাসিক এলাকা, মুক্তিযোদ্ধা বসতিনগর, জলিল টেক্সটাইল মিলস, সীমা অটোমেটিক স্টিল রি-রোলিং মিলসের নাম রয়েছে। এমনকি ফৌজদার হাট ক্যাডেট কলেজের সীমানার ভেতরেও এই জমি রয়েছে।
অর্ধশত প্রতিষ্ঠানের জমি চাহিদা
দখল উচ্ছেদ করে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের ঘোষণার পর চট্টগ্রামের অন্তত অর্ধশত প্রতিষ্ঠান জেলা প্রশাসকের কাছে জমি বরাদ্দের আবেদন করেছে। এর মধ্যে অধিকাংশই সরকারি প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ৩৫০ একর, পুলিশের পাঁচ ইউনিট পৃথকভাবে ২৫ থেকে ১৪৫ একর, চট্টগ্রাম সেনানিবাস ১ হাজার একর, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি ২৩৮ দশমিক ১৩ একর, র্যাব-৭ ১০ একর, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ১২০ একর, এনএসআই ১০ একর, চট্টগ্রাম ওয়াসা ১০০ একর, বাংলাদেশ বেতার ২৫ একর এবং বিজিএমইএ ২০০ একর জমি চেয়েছে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য ৩৬ দশমিক ৫ একর, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিসিএস প্রশাসন একাডেমির জন্য ৫০ একর, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ৫০০ একর, কারা ডিআইজির কার্যালয় ৭৫ একর, জেলা ক্রীড়া সংস্থা ৪০ একর, চট্টগ্রাম চেম্বার ১২ একর, প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপ ২৫ একর, আল মানাছিল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন ৫০ একর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন ৩০ একর, ইউনিভার্সিটি অব গ্র্যান্ড ৫ একর, বাংলাদেশ জেলা ও বিভাগীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ১০ একর, খাদ্য বিভাগ ৫০ একর, ফায়ার সার্ভিস ১০ একর, কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড ২৫ একর, মেট্রোপলিটন শুটিং ক্লাব ২০ একর, অটিস্টিক বিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ৬ একর, বাংলাদেশ স্কাউটস চট্টগ্রাম অঞ্চল ৫ একর, বুড্ডিস্ট রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন সেন্টার ১০ একর, বোধিজ্ঞান ভাবনা কেন্দ্র ৬৬ একর, জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির প্রশিক্ষণকেন্দ্র ১০ একর এবং জেএম শিপব্রেকিং রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রি ২৫ একর জমি চেয়েছে।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য
বারবার চেষ্টা করেও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত যুগান্তরকে বলেন, ‘সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানিয়েছেন, তার অফিসের রেকর্ডে ৯১০ একর জমি আছে। এই জমি কীভাবে আবেদনকারীদের দেওয়া হবে, তা ভূমি মন্ত্রণালয় দেখবে।’ ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমদ জানান, জঙ্গল সলিমপুরের জমির প্রকৃত চিত্র জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন আকারে চাওয়া হবে এবং প্রভাবশালীদের অবস্থান খতিয়ে দেখা হবে।



