ব্রাজিলের শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সীদের কাছে নেইমার সমান জনপ্রিয়
ব্রাজিলের শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সীদের কাছে নেইমার সমান জনপ্রিয়

ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে নেইমার জুনিয়রের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা। ১২৮ ম্যাচে ৭৯ গোল ও ৫৯ অ্যাসিস্ট করে তিনি দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও অ্যাসিস্ট প্রদানকারী। দেড় দশক ধরে তিনি ব্রাজিলের পোস্টার বয়। বর্তমান তরুণ তারকারা তাঁকে আইডল মানেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সীদের কাছে তিনি সমান জনপ্রিয়। তবু কোথাও যেন একটা কমতি রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক শিরোপার অভাব

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে নেইমার যতটা উঁচুতে, বিশ্ব ফুটবলে ঠিক ততটা নন। তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেটে বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা নেই। সর্বোচ্চ সফলতা ২০১৩ সালের ফিফা কনফেডারেশন কাপ এবং ২০১৬ সালের অলিম্পিক গোল্ড মেডেল। কিন্তু এই দুটি শিরোপা তেমন বড় নয়। ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ পুরস্কার ব্যালন ডি’অরও নেই। বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তিদের তালিকায় নিজের নাম খোদাই করতে হলে একটা বিশ্বকাপ চাই–ই চাই। সেটা নেইমারের প্রত্যেক সমর্থকই একবাক্যে স্বীকার করেন। আবার সমালোচকেরা এই একটি কারণে নেইমারকে কিংবদন্তির কাতারে ফেলতে চান না।

চোটের সঙ্গে লড়াই

নেইমারের ক্যারিয়ার চোটের কারণে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০২২ সালের ৯ ডিসেম্বর কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বাদ পড়ে ব্রাজিল। সেই হারের পর ২৭৩ দিন জাতীয় দলের বাইরে ছিলেন নেইমার। ২০২৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বলিভিয়ার বিপক্ষে ফেরেন তিনি। কিন্তু ১৭ অক্টোবর উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে এসিএল চোট পেয়ে মাঠের বাইরে ছিটকে পড়েন। এরপর একাধিকবার ডাক পেলেও চোটের কারণে ফিট হয়ে উঠতে পারেননি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আল হিলাল ছেড়ে সান্তোসে নাম লেখান। ক্লাবটির হয়ে ম্যাচ খেললেও পুরোপুরি ফিট হতে পারছিলেন না। আরও কয়েকবার চোটে পড়েন। ফলে ফেরাটা আরও দীর্ঘ হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২০২৬ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি

এবার নেইমারও একই ঘটনার মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন। চোটের কারণে গত চার বছরে ব্রাজিলের হয়ে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলতে পেরেছেন। বাকিটা সময় থাকতে হয়েছে মাঠের বাইরে। ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। এই ম্যাচের মধ্য দিয়েই ৯৭৫ দিন পর হলুদ জার্সি পরে মাঠে নামতে যাচ্ছেন নেইমার। শুরু হচ্ছে বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তিদের তালিকায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখার মিশন।

অদম্য মানসিক শক্তি

একজন বড় ফুটবলারের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর ধৈর্য ও মানসিকতা। নেইমার সেই ক্ষেত্রে শতভাগ মার্ক পাবেন। চোটের কারণে এত দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকাটা যে কতটা যন্ত্রণার, তা গত মাসে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা নেইমারের বাবার এক খোলাচিঠিতেই উঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন, ‘মন্তেভিদিওতে সেই চোটের পর থেকে যে যন্ত্রণা আর সংশয় আমাদের তাড়া করে বেড়িয়েছে, তা নিয়ে চাইলে আমি অনেক কিছুই লিখতে পারতাম, বাবা। এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় মুখ বুজে আমাদের যেসব মন্তব্য শুনতে বা পড়তে হয়েছে, সেগুলোও মনে করিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু আজ আনন্দের দিন...। এই মুহূর্তে শুধু সেসব শিশুর হাসিমুখই আমার চোখে ভাসছে, যারা যেখানেই তোমাকে দেখেছে, তোমার নাম ধরে চিৎকার করেছে। আমরা জানি, এই মুহূর্তটির জন্য তুমি কতটা উন্মুখ ছিলে, কতটা কঠোর পরিশ্রম করেছ। সব কষ্ট, সন্দেহ ও নীরবতা পেরিয়ে ঈশ্বর এত দূর আমাদের সাহায্য করেছেন। অভিনন্দন, বাবা! আরেকটি বিশ্বকাপে আমি তোমার পাশেই থাকব!’

নেইমারের উত্তরাধিকার

৩৪ বছর বয়সী নেইমার এবারের বিশ্বকাপটা খুব করে চেয়েছেন খেলতে। সেটার জন্যই চোটের সঙ্গে এই দীর্ঘ লড়াই। তাঁর ক্যারিয়ারে এটা চতুর্থ ও শেষ বিশ্বকাপ। ব্রাজিলকে তাদের বহুল প্রতীক্ষিত ‘হেক্সা’ শিরোপা এনে দিতে চান তিনি। তারপরই যে তিনি পাবেন ফুটবল ইতিহাসে অমরত্ব। যদিও এই ফরোয়ার্ড মনে করছেন, ফুটবল ইতিহাসে তাঁর স্থায়ী জায়গা এরই মধ্যে তৈরি হয়ে আছে। ব্রাজিলের ফুটবলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সম্প্রতি রেডবুল আল্টিমেট সকার চ্যালেঞ্জে অংশ নিতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে নেইমার বলেন, ‘আমি মনে করি ফুটবলে আমার লিগ্যাসি তৈরি হয়ে গেছে। ফুটবলের কথা উঠলে যে কেউই কোনো না কোনোভাবে আমাকে মনে রাখবে। তাই আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে আমি ইতিহাস গড়তে পেরেছি, ফুটবলের ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করে রেখে যেতে পেরেছি। একদিন আমি আমার সন্তানদের, নাতি-নাতনিদের বলতে পারব, দেশের জন্য আমি কত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছি।’

বাংলাদেশ সময় ১৪ জুন ভোর ৪টায়, ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। এই ম্যাচের মধ্য দিয়েই হয়তো ৯৭৫ দিন পর বিখ্যাত হলুদ জার্সি পরে মাঠে নামতে যাচ্ছেন নেইমার। আর শুরু হচ্ছে বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের কিংবদন্তিদের তালিকায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখার মিশন। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা সমর্থকেরাও চান এই মিশন সফল হোক।