ভারতের মানচিত্রের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত গ্রেট নিকোবর দ্বীপটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার এই দ্বীপকে ভারত মহাসাগরে একটি প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তুলতে ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
প্রকল্পের বিবরণ ও বিতর্ক
এই মেগা প্রকল্পের আওতায় একটি পণ্য খালাসের বন্দর, বেসামরিক-সামরিক বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পর্যটন অবকাঠামো এবং ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষের বসবাসের জন্য একটি জনপদ গড়ে তোলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, সামুদ্রিক বাণিজ্যের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এই বিনিয়োগ করা হচ্ছে। তবে পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিরোধীদলীয় নেতারা প্রকল্পটির তীব্র সমালোচনা করছেন।
পরিবেশ ও আদিবাসী অধিকার
গ্রেট নিকোবর দ্বীপের গভীর অরণ্যে বসবাসকারী শম্পেন জনগোষ্ঠী ও নিকোবরি আদিবাসীরা প্রকল্পের কারণে হুমকির মুখে পড়েছেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩৯ জন গণহত্যাবিশেষজ্ঞ ভারতের রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখে সতর্ক করেন যে এই প্রকল্প শম্পেনদের জন্য 'মৃত্যুদণ্ডের' মতো। ভারতের পরিবেশমন্ত্রী ২০২৩ সালে পার্লামেন্টে জানান, প্রকল্পের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৬৪ হাজার গাছ কাটা হবে।
কৌশলগত গুরুত্ব
দ্বীপটি মালাক্কা প্রণালির পশ্চিম প্রবেশপথের খুব কাছে অবস্থিত, যা বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য ও সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক ভাইস চিফ শেখর সিনহা বলেন, 'এই দ্বীপের কৌশলগত গুরুত্ব আছে। এটি মালাক্কা প্রণালির মুখে অবস্থিত।' চীনের জন্য এই প্রণালি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চীন তাদের অপরিশোধিত তেল আমদানির ৮০ শতাংশ এই পথে করে থাকে।
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানাপোড়েনের পর গ্রেট নিকোবর প্রকল্প আরও জোরদার হয়েছে। সরকারের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রকল্পটির লক্ষ্য আন্দামান সাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের উপস্থিতি শক্তিশালী করা। তবে বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী প্রকল্পটিকে 'উন্নয়নের নামে ধ্বংসযজ্ঞ' বলে অভিহিত করেছেন।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
দ্বীপটি ভূমিকম্পের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ 'সিসমিক জোন ৫'-এ অবস্থিত, যা বড় নির্মাণ প্রকল্পকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। গবেষক মনিষ চান্ডি বলেন, 'এই প্রকল্প প্রচণ্ড ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রকাশ।' অন্যদিকে, বিশ্লেষকরা মনে করেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতিতে ভারতের নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে নতুন করে মূল্যায়ন করা স্বাভাবিক।



