নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপদ অভিবাসন শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক
নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপদ অভিবাসন শীর্ষক বৈঠক

নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপদ অভিবাসন শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক

‘নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপদ অভিবাসন’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা নারী অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন। বৈঠকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক এমপি, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের যুগ্ম সচিব ড. এটিএম মাহবুব-উল করিম, বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য

মো. নুরুল হক বলেন, অভিবাসনের ক্ষেত্রে নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে নিরাপত্তাহীনতার ঘটনা বেশি ঘটে। এখন কিছু দেশের সঙ্গে চুক্তির ফলে মামলা ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া, কোরিয়া, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার, সিন্ডিকেট, পরীক্ষা ও নিয়োগ ব্যবস্থায় নানা সমস্যা আছে। তিনি স্বচ্ছতা ও অনিয়ম কমানোর ওপর জোর দেন।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, একই ধরনের প্রশিক্ষণ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে হচ্ছে, যা সমন্বয় করা দরকার। কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো (টিটিসি) আধুনিকীকরণে মনোযোগ দেওয়া হবে। প্রবাসী কল্যাণে অনলাইন সেবা চালু হয়েছে, যাতে দালাল নির্ভরতা কমে। নারী শ্রমিকদের দক্ষ করে বিদেশে পাঠানো, আইনি ফার্ম নিয়োগ, ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধা ও পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের বক্তব্য

ড. এটিএম মাহবুব-উল করিম বলেন, ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পর থেকেই একজন কর্মীর কল্যাণের দায়িত্ব ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড গ্রহণ করে। বিদেশে অসুস্থ বা জেলে গেলে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়। ৪০০ টাকায় সদস্য হয়ে বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া যায়। দেশে ফেরার এক বছরের মধ্যে অসুস্থতার কারণে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়। প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসে দুই হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয়। বিদেশে আহত হলে ৫০০ টাকা প্রিমিয়ামের বিপরীতে সর্বোচ্চ চার লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়। মৃত্যুর ক্ষেত্রে ৩০০ টাকায় সদস্য থাকলে মরদেহ দেশে আনা ও দাফন খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা এবং ওয়ারিশদের তিন লাখ টাকা দেওয়া হয়। রিইন্টিগ্রেশন নীতির আওতায় ২ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

বিলসের নির্বাহী পরিচালকের বক্তব্য

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, অভিবাসন ও অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য বাস্তবভিত্তিক নীতিকাঠামো তৈরি করা জরুরি। আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে মৌলিক সংস্কারের পথে অগ্রসর হওয়া যায়। তিনি শ্রমিকদের মর্যাদার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বলেন, দর কষাকষির মাধ্যমে মূল্য কমানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। নেপালের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ঢাকায় গৃহকর্মীদের রেজিস্ট্রেশন শুরু করলে পরিবর্তন আসবে। সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি

রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, কাজের ধরন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। নারী শ্রমিকদের নতুন দক্ষতায় প্রস্তুত করা জরুরি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, আমরা কত দিন শুধু গৃহকর্মী সরবরাহকারী দেশ হয়ে থাকব? কেয়ারগিভার, স্বাস্থ্যসেবা, হসপিটালিটি ও অন্যান্য খাতে প্রবেশের জন্য পরিকল্পনা নিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি শ্রমবাজারে প্রভাব ফেলতে পারে, তাই আগাম বিশ্লেষণ ও প্রস্তুতি প্রয়োজন। আস্থার সংকট দূর করতে উপার্জিত টাকার ওপর নারীর পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অভিবাসন ব্যয় কমাতে রিক্রুটিং এজেন্সির জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ফিরে আসা নারীদের জন্য বিনিয়োগ সুরক্ষা, ছোট ব্যবসায় সহায়তা ও থানাভিত্তিক সহায়তা ডেস্ক দরকার।

আইওএমের বক্তব্য

ফারজানা শাহনাজ বলেন, অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও সুরক্ষা পুরো প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক তথ্যের অভাবে গ্রাম পর্যায়ের মানুষ দালালের ওপর নির্ভর করে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাম পর্যায়ে তথ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা জরুরি। প্রি-ডিপারচার মডিউল আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অভিবাসনের শুরু থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত মনিটরিং শক্তিশালী করতে হবে।

বোয়েসেলের বক্তব্য

নু-এমং মারমা মং বলেন, বোয়েসেল ১৯৮৪ সাল থেকে নৈতিক, নিরাপদ ও দক্ষ অভিবাসন নিশ্চিত করে আসছে। সরকার টু সরকার চুক্তির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। ২০১০ সাল থেকে জর্ডানের গার্মেন্টস খাতে নারী কর্মী সম্পূর্ণ বিনা খরচে পাঠানো হচ্ছে। বোয়েসেলের মাধ্যমে যাঁরা যান, তাঁদের প্রতারিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। প্রতিটি দেশের নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় আগে থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়। প্রি-ডিপারচার ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাসী করে বিদেশে পাঠানো হয়।

আইএলওর বক্তব্য

রাহনুমা সালাম খান বলেন, আইএলও সরকারের সঙ্গে ন্যায্য নিয়োগ ও নিরাপদ কাজ নিশ্চিতে কাজ করছে। ২০২৫ সালের নীতিমালায় অভিবাসন ব্যয় কমাতে রিক্রুটিং এজেন্সির দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। টিটিসিগুলোর প্রশিক্ষণ বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তাই সংস্কার দরকার। নারীদের জন্য আলাদা টিটিসির কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। ২০১৬ সালের নীতিতে নতুন শ্রমবাজার খোঁজার কথা বলা হলেও রোডম্যাপ নেই। জেন্ডার সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।

ইউএনডিপির বক্তব্য

শারমিন ইসলাম বলেন, একজন নারী প্রথমবার দেশের বাইরে গেলে মানসিক ও সামাজিক ট্রমার মুখোমুখি হন। বিমানবন্দরে বিভ্রান্ত অবস্থায় থাকেন। তিন দিনের প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। কাজের ধরন পরিবর্তন হচ্ছে, তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা প্রয়োজন। দেশে ফিরে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক হয়। রাষ্ট্র যদি শ্রমিকদের সম্মান দেয়, তাহলে সমাজও তা অনুসরণ করবে।

বিএনএসকের পরিচালক

এস কে মজিবুল হক বলেন, নারীরা সঠিক সহায়তার অভাবে বিদেশে কাজের জায়গা তৈরি করতে পারেন না। অধিকাংশ নারীকে ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। ফিলিপাইনের নারীরা নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ করতেন না। প্রবাসী কমিউনিটিকে মনিটরিংয়ে যুক্ত করতে হবে। ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মনিটরিং জরুরি। বিএমইটির সেবাকেন্দ্রগুলো নারীবান্ধব করতে হবে।

ওয়্যারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন

জাছিয়া খাতুন বলেন, বিগত ৮ বছরে প্রায় ৮০০ নারী অভিবাসী মৃত্যুবরণ করে দেশে ফিরেছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক বা আত্মহত্যা বলা হয়, কিন্তু সঠিক কারণ জানা দরকার। বর্তমানে ১০ লাখের বেশি নারী বিদেশে কর্মরত, কিন্তু গত কয়েক বছরে নারী অভিবাসন কমেছে। নতুন শ্রমবাজারের ঘাটতি ও নারীবান্ধব কাজের পরিবেশ অপ্রতুল। মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োগদাতাদের তালিকা কঠোরভাবে মনিটর করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ নিয়োগদাতাদের কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে সুরক্ষা জোরালো করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার জন্য ইনস্যুরেন্স ব্যবস্থা করতে হবে।

রামরুর বক্তব্য

মেরিনা সুলতানা বলেন, মোট অভিবাসনের মধ্যে প্রায় ১৩.৫ শতাংশ নারী, কিন্তু তাঁরা সুরক্ষার বাইরে থাকছেন। এটি প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত। নারীর মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত না হলে নিরাপদ অভিবাসন সম্ভব নয়। হংকং বা সিঙ্গাপুরের মতো বাজার ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সাব-এজেন্ট রেগুলেশন ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ।

বাদাবন সংঘের বক্তব্য

লিপি রহমান বলেন, বাদাবন সংঘ ২০১৬ সাল থেকে নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে। ২০২০ সালে ইউএন উইমেনের সহায়তায় কোভিডের সময় দেশে ফেরা নারীদের নিয়ে কাজ করা হয়। ২০২৪-২৫ সালে ছয় জেলায় নারী নেতৃত্বে ফোরাম গঠন করা হয়। ফারিহা জেসমিন বলেন, ২০০১-২০২২ সালের মধ্যে ১০ লাখ ৯৫ হাজারের বেশি নারী বিদেশে গেছেন। ২৭.৬ শতাংশ নারী কোনো আয়ের উৎস ছাড়াই অভিবাসনে গেছেন, যা বাধ্যতামূলক অভিবাসন নির্দেশ করে। কাফালা সংস্কার, ডিজিটাল মজুরি সুরক্ষা ও দ্রুত শ্রম আদালত জরুরি।

বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশন

শেখ রোমানা বলেন, উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে কার্যকর হয় না। পুনর্বাসন সহায়তা থাকলেও কতজন সত্যিকার পুনর্বাসন পাচ্ছেন, তা প্রশ্নবিদ্ধ। এথিক্যাল রিক্রুটমেন্ট বাস্তব হয়নি। তৃণমূল পর্যায়ে উঠান বৈঠক ও প্রি-ডিপারচার ট্রেনিং দেওয়া হয়। নির্যাতিত হয়ে সন্তানসহ দেশে ফেরা নারীদের সন্তানের দায় রাষ্ট্র নিতে হবে। দূতাবাসে জনবল কম, তাই শক্ত মনিটরিং দরকার।

অভিবাসী নারী শ্রমিক ফেডারেশন

মাহমুদা সুলতানা বলেন, অনেকেই নিজের ইচ্ছায় বিদেশে যান না। তিন দিনের প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। বিদেশে হয়রানি হলে আইনি সহায়তার অজ্ঞতা থাকে। ফিরে এসে পুনর্বাসন সহায়তা পান না। ৪৫-৫০ বছর বয়সীদের করুণ অবস্থা হয়। ফেরত আসা নারীদের জন্য সরকারি কার্ড বা ভাতার কাঠামো দরকার।

সুপারিশ

  • অভিবাসনের পুরো চক্র মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ অভিবাসন নীতি কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
  • কাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক ও বাজারভিত্তিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।
  • কেরাগিভার ছাড়াও স্বাস্থ্যসেবা, কনস্ট্রাকশন, ইলেকট্রিক, ওয়েল্ডিংসহ নতুন খাতে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা।
  • রিক্রুটিং এজেন্সি ও সাব-এজেন্টদের জন্য কঠোর লাইসেন্সিং, গ্রেডিং ও জবাবদিহির ব্যবস্থা চালু করা।
  • নারীদের উপার্জনের ওপর পূর্ণ আর্থিক অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
  • অভিবাসন প্রক্রিয়ায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করে নারী-পুরুষ বৈষম্য দূরীকরণ।