মিউনিখের চার মুখ: ঐতিহ্য, বিশ্বাস, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ
মিউনিখের চার মুখ: ঐতিহ্য, বিশ্বাস, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ

৮ নভেম্বর ২০২৫ ইং ডাকাউ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের বিভীষিকাময় নিদর্শন দেখার পরে বিকেলে ৩২ কিলোমিটার দূরে মিউনিখ শহরের কেন্দ্রে হোটেলে ফিরে আসি। যাওয়ার পথে ডাকাউয়ের নিষ্ঠুরতার চিহ্ন চোখে ভাসতে থাকে। শহরের হাম্পটন বাই হিলটন হোটেলে উঠলাম, যেখানে দুটি কক্ষ আগেই বুকিং দেওয়া ছিল। হোটেলে ঢুকতেই বিদেশি পর্যটকদের কোলাহল বেশ আনন্দের ছিল। রাত ৯টার দিকে অনিত ও আনিকা আমাদের নিয়ে যায় শহরের সেন্ট পল এলাকায় একটি বিশেষ হোটেলে আফগানি বিরিয়ানি খেতে। বেশ মুখরোচক খাবার, বিভিন্ন মসলা ও জাফরানের সুঘ্রাণে বিরিয়ানি দারুণ উপভোগ্য ছিল। নৈশভোজ শেষে রাত ১২টায় ট্রাম ও বাসে ফেরার পথে আমাদের প্রচণ্ড ঠান্ডা ও হালকা বৃষ্টির মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

পরের দিন ৯ নভেম্বর: মিউনিখের চার মুখ

পরের দিন ৯ নভেম্বর আমরা মিউনিখের মূল চারটি স্থান পর্যবেক্ষণে যাই। এই শহরের চারটি মুখ—ঐতিহ্য, বিশ্বাস, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ। হুফব্রয়ের প্রাণচঞ্চলতা, ফ্রাউয়েনকির্খের নীরব গাম্ভীর্য, অলিম্পিক পার্কের গৌরবমিশ্রিত বেদনা, আর বিএমডব্লিউ–এর প্রযুক্তির দীপ্তি, সব মিলিয়ে মিউনিখ দর্শন এক অনন্য অভিজ্ঞতা। মিউনিখ শুধু জার্মানির একটি সুন্দর শহর নয়, এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প ও আধুনিকতার এক অনন্য সম্মিলন। মধ্যযুগের বাভারিয়ান ঐতিহ্য, রাজকীয় উত্তরাধিকার, যুদ্ধের স্মৃতি এবং আধুনিক ইউরোপের প্রাণচাঞ্চল্য—সব মিলিয়ে মিউনিখ যেন জীবন্ত ইতিহাসের শহর। এই শহরকে বুঝতে হলে তার কিছু স্মরণীয় স্থানের কাছে যেতে হয়।

মারিয়েনপ্লাৎস—মিউনিখের আত্মা ফ্রাউয়েনকির্খে

মারিয়েনপ্লাৎস জার্মানির মিউনিখ শহরের কেন্দ্রীয় প্রধান স্কয়ার (চত্বর), যেখানে নিউ টাউনহল অবস্থিত, একটি ঐতিহাসিক ভবন। মিউনিখের আকাশজুড়ে তখন ধূসর মেঘের আস্তরণ, ঠান্ডা বাতাস ভেজা শহরের রাস্তাগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল, আর টুপটাপ বৃষ্টি। সময়কে ধরে রাখতে সেই বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেই দুপুর ১২টায় আমরা পৌঁছেছিলাম ফ্রাউয়েনকির্খে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গির্জার সামনে পৌঁছে আমরা কিছুক্ষণ থেমেছিলাম। ঠান্ডা বাতাসে শিশু পর্যটক রূপকথার মুখটা আরও লাল হয়ে উঠেছিল। ঠান্ডা ও বৃষ্টির মধ্যে আমাদের অত্যন্ত শান্ত শিশুকে আলতো করে জড়িয়ে স্ট্রলারের ওপরে প্লাস্টিকের ছাউনি দিয়ে রেখেছিলাম এবং আমরা রেইনকোটে আচ্ছাদিত ছিলাম। গির্জার সামনে ভেজা এলাকাজুড়ে বৃষ্টির মধ্যে শত শত পর্যটকের কোলাহল, সংগীতের তালে তালে একদল তরুণ–তরুণীদের শারীরিক কসরত দারুণ উপভোগ্য ছিল।

জার্মানির মিউনিখ শহরের হৃদয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই অনন্য স্থাপত্য ফ্রাউয়েনকির্খে, যার পূর্ণ নাম ক্যাথেড্রাল অব আওয়ার ডিয়ার লেডি, এটি শুধু একটি গির্জা নয়; বরং মিউনিখের ইতিহাস, বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং নাগরিক পরিচয়ের প্রতীক। দূর থেকে শহরের দিকে তাকালেই যে দুটি সবুজ গির্জার চূড়া চোখে পড়ে, সেটিই ফ্রাউয়েনকির্খে। গির্জাটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ১৪৬৮ সালে এবং দ্রুততার সঙ্গে ২০ বছরের মধ্যেই এর মূল কাঠামো সম্পন্ন হয়। সেই সময়ের জন্য এটি ছিল বিস্ময়কর দ্রুত নির্মাণকাজ।

এই গির্জা নির্মিত হয়েছিল লাল ইট দিয়ে। কারণ, আশপাশে বড় পাথরের খনি সহজলভ্য ছিল না। ফলে এর স্থাপত্যে একধরনের সরল অথচ শক্তিশালী সৌন্দর্য তৈরি হয়েছে। গথিক শৈলীর বিশাল কাঠামো হলেও এর গম্বুজ দুটি পরে রেনেসাঁ প্রভাবিত নকশায় তৈরি করা হয়, যা আজ মিউনিখের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর দুই বিশাল টাওয়ার, যেগুলোর উচ্চতা প্রায় ৯৯ মিটার। দীর্ঘদিন ধরে মিউনিখ শহরে এর চেয়ে উঁচু ভবন নির্মাণে সীমাবদ্ধতা ছিল, যেন এই ক্যাথেড্রালের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে। ভেতরে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে অসংখ্য সুউচ্চ স্তম্ভ, বিশাল খিলান এবং গম্ভীর নীরবতা। বাহিরের আলো রঙিন কাচের জানালা দিয়ে প্রবেশ করে এক অপার্থিব আবহ সৃষ্টি করে।

প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, শয়তান নাকি গির্জাটি নির্মাণে সাহায্য করেছিল এই শর্তে যে এতে কোনো জানালা থাকবে না। নির্মাণ শেষে সে যখন ভেতরে দাঁড়ায়, তখন এমন এক কোণ থেকে দেখে, যেখানে জানালাগুলো স্তম্ভের আড়ালে লুকিয়ে যায়। মনে হয়, শয়তানের শর্ত পূরণ হয়েছে। আনন্দে সে পা ঠুকে হাসে, আর সেই পদচিহ্ন নাকি আজও গির্জার মেঝেতে রয়ে গেছে। এই রহস্যময় দাগ আজও পর্যটকের কৌতূহলের কেন্দ্র।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিউনিখে ব্যাপক বোমা হামলা হয়েছিল। ফ্রাউয়েনকির্খের স্থাপনাগুলো গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। গির্জার ছাদ ধসে পড়ে, অভ্যন্তরের অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু যুদ্ধের পরে মিউনিখ শহরবাসী এটিকে আবার পুনর্নির্মাণ করে। এই পুনর্জন্ম শুধু একটি ভবনের পুনর্গঠন ছিল না; এটি ছিল মিউনিখের মানুষের আশার প্রতীক। মেরিওপ্লাজের গির্জায় ঘণ্টা বাজানোর প্রথা বহু শতাব্দী পুরোনো। ফ্রাউয়েনকির্খের মতো ইউরোপের অনেক ক্যাথেড্রালেই ঘণ্টাধ্বনি শুধু শব্দ নয়; বরং বিশ্বাস, সময় এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক প্রতীক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মানুষকে প্রার্থনার জন্য আহ্বান করা। আগের যুগে ঘড়ি বা মোবাইল ছিল না, তাই ঘণ্টার শব্দ শুনেই মানুষ বুঝত, প্রার্থনার সময় হয়েছে।

ফ্রাউয়েনকির্খের ঘণ্টাধ্বনি মিউনিখ শহরের অন্যতম পরিচিত শব্দ। বিশেষ করে দুপুরে কিংবা সন্ধ্যার সময় সেই গভীর ধ্বনি পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ঠান্ডা বাতাসে সেই শব্দ শুনলে মনে হয়, যেন ইতিহাস নিজেই কথা বলছে। বৃষ্টিভেজা সেদিনের দুপুরের পরিবেশে এই ঘণ্টাধ্বনি গভীর ও আবেগময় লেগেছিল। কারণ, তখন শব্দটা শুধু গির্জার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিশেষ করে নিউ টাউনহলের বিখ্যাত ঘণ্টার সঙ্গে কয়েকটি তলায় স্থাপিত বিভিন্ন সাজে ছোট ছোট মানবমূর্তি অদ্ভুতভাবে নড়াচড়া করে, নাচে, যুদ্ধের দৃশ্য দেখায় বা ঐতিহাসিক ঘটনা অভিনয় করে। পর্যটকদের কাছে এটিকে ‘পুতুলের নাচ’ বলেই মনে হয়।

হুফব্রয় বিয়ার হাউস: ইতিহাস ও প্রাণের মিলনস্থল

মহিমান্বিত ক্যাথেড্রাল দর্শন শেষে আমরা পায়ে হেঁটে ১৫৮৯ সালে বাভারিয়ার ডিউক উইলিয়াম-V–এর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হুফব্রয় হাউস দেখতে গেলাম। মিউনিখের ঐতিহ্যবাহী ও বিশ্ববিখ্যাত বিয়ার হল—এটি প্রথমে ছিল রাজদরবারের ব্রুওয়ারি, পরে হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের মিলনকেন্দ্র। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই স্থান রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের সাক্ষী। কাঠের দরজা পেরোতেই চোখে পড়ে অন্য এক জগৎ—কাঠের লম্বা টেবিল, লোকসংগীত, প্রাচীন সরাইখানার আবহ আর উৎসবমুখর উচ্ছ্বাস আজও বাভারিয়ার প্রাণ বহন করে। ভেতরে ঢুকতেই কানে এল একসঙ্গে বহু স্বরের ঢেউ—হাসি, গান, মগের ঠোকাঠুকি, দূরে ব্রাস ব্যান্ডের সুর। ব্যান্ডের সুরের মূর্ছনায় হলের অভ্যন্তরে শত শত ভ্রমণপিপাসু সবাই বিয়ারের গ্লাস হাতে নিয়ে নাচছে, মনে হলো আনন্দফুর্তিই এদের জীবনের সঙ্গে মিশে আছে। ঐতিহাসিক এমন একটি স্থানে এসে একটু বিয়ারের স্বাদ না নিলে কি হয়? অনিত আমার হাতে দেড় লিটার বিয়ারের মগ এনে দিল, চুমুক দিতেই মনে হচ্ছিল, এখানে ইতিহাস যেন এখনো মানুষের আনন্দ ও হাসির মধ্যে বেঁচে আছে।

জার্মানির প্রকৌশলের গর্ব—বিএমডব্লিউ

এরপর আমাদের গন্তব্য ছিল মিউনিখের শিল্প–ঐতিহ্যের উজ্জ্বল প্রতীক বিএমডব্লিউয়ের গাড়ির শোরুম দর্শন। জার্মানির মিউনিখ শহরই এর জন্মভূমি। শহরের আধুনিক স্থাপত্য, শিল্প ও প্রযুক্তির পরিচয়ের সঙ্গে বিএমডব্লিউ যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। এখানে শুধু গাড়ির ইতিহাস নয়, জার্মান শিল্পোন্নয়নের কাহিনিও জানা যায়। বিএমডব্লিউ মিউজিয়াম শুধু প্রদর্শনী কেন্দ্র নয়; বরং আধুনিক প্রকৌশল ও উদ্ভাবনের প্রতীক। বিএমডব্লিউ শুধু একটি গাড়ির নাম নয়; এটি জার্মান শৃঙ্খলা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং ভবিষ্যতের প্রতি আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান শুরুতে বিমানের ইঞ্জিন তৈরি করত। পরে মোটরসাইকেল ও গাড়ি নির্মাণে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করে। নিখুঁত প্রযুক্তি, শক্তিশালী ইঞ্জিন, আরামদায়ক নকশা ও চালনার আনন্দ—এই চার বৈশিষ্ট্য বিএমডব্লিউকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। জার্মান প্রকৌশলদক্ষতার কথা উঠলেই প্রথম সারিতে আসে এই বিএমডব্লিউ (BMW) যার পূর্ণ নাম Bayerische Motoren Werke—অর্থাৎ, ‘বাভারিয়ান মোটর ওয়ার্কস’। শোরুমের ক্যাফেটেরিয়ায় মধ্যাহ্নভোজ সেরে আমরা ঘুরে ঘুরে শোরুমে বিএমডব্লিউর শুরু থেকে এই প্রজন্মের অত্যাধুনিক মডেলের গাড়ি দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম, আর ভাবছিলাম, এর কোনোটাই তো কেনার সৌভাগ্য হবে না, তবে দেখে যা একটু তৃপ্তি লাভ।

মিউনিখ অলিম্পিক পার্ক—বাভারিয়ান মোটর ওয়ার্কস দর্শন শেষে

রূপকথার স্ট্রলার ঠেলে আমরা হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই মিউনিখ অলিম্পিক পার্কে। ১৯৭২ সালে গ্রীষ্মকালে নির্মিত এই পার্ক আধুনিক জার্মানির পুনর্জন্মের প্রতীক। তথ্যসূত্রে জানা যায়, যুদ্ধোত্তর জার্মানি বিশ্বকে শান্তি ও উন্মুক্ততার বার্তা জানাতে এই অলিম্পিক আয়োজন করেছিল। বিচিত্র ঢেউখেলানো স্বচ্ছ ছাদের স্টেডিয়াম যেন নতুন যুগের প্রতীক। কিন্তু একই সঙ্গে এই স্থান বহন করে মিউনিখ হত্যাকাণ্ডের বেদনাময় স্মৃতি। ১৯৭২ সালে অলিম্পিক চলাকালে মিউনিখে সংঘটিত এক মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলা। ৫ সেপ্টেম্বর ফিলিস্তিনি সংগঠন ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর ইসরায়েলি অলিম্পিক দলের সদস্যদের জিম্মি করে। তাদের দাবি ছিল, ইসরায়েলে বন্দী ফিলিস্তিনিদের মুক্তি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য জার্মান পুলিশ উদ্ধার অভিযান চালায়, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত ১১ জন ইসরায়েলি ক্রীড়াবিদ, কোচ এবং একজন জার্মান পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। কয়েকজন হামলাকারীও নিহত হয়। সেদিন অলিম্পিকের সব আনন্দ মুহূর্তেই ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছিল। তাই এই পার্ক শুধু সৌন্দর্যের নয়, ইতিহাসেরও নীরব স্মৃতিস্তম্ভ।

মিউনিখের এই চার স্থান যেন শহরটির চারটি মুখ—ঐতিহ্য, বিশ্বাস, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ। হুফব্রয়ের প্রাণচঞ্চলতা, ফ্রাউয়েনকির্খের নীরব গাম্ভীর্য, অলিম্পিক পার্কের গৌরবমিশ্রিত বেদনা, আর BMW-এর প্রযুক্তির দীপ্তি—সব মিলিয়ে মিউনিখ এক অনন্য অভিজ্ঞতা। মিউনিখ ভ্রমণ মানে শুধু স্থান দেখা নয়, ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া—জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]