বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত কবিতা ‘বনলতা সেন’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে প্রায় আড়াই ঘণ্টার চলচ্চিত্র। পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল এই বহুল পঠিত কবিতাকে কেন্দ্র করে সিনেমা বানিয়ে যেমন সাহস দেখিয়েছেন, তেমনি ঝুঁকিও নিয়েছেন। কারণ দর্শক এখানে শুধু একটি গল্প দেখতে আসেন না; সঙ্গে নিয়ে আসেন নিজের কল্পনার বনলতা সেনকেও। ‘বনলতা সেন’ সিনেমাটি সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। তবে এটি শুধু একটি কবিতার রূপান্তর নয়; এখানে ইতিহাস, স্মৃতি, স্বপ্ন ও বর্তমান সময় একাকার হয়ে গেছে।
একনজরে সিনেমা
- সিনেমা: ‘বনলতা সেন’
- জনরা: ড্রামা, ফ্যান্টাসি
- প্রেরণা: ‘বনলতা সেন’, জীবনানন্দ দাশ
- চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: মাসুদ হাসান উজ্জ্বল
- অভিনয়: মাসুমা রহমান নাবিলা, খায়রুল বাসার, সোহেল মন্ডল, মাইমুনা মম, রূপন্তী আকিদ, প্রিয়ন্তী উর্বী, সুমাইয়া পারভিন, নাজিবা বাশার
- দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ২২ মিনিট
সিনেমার শুরুতে দেখা যায় এক্সট্রা ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে একটি শট। চরের বালুতে মরে আছে অনেক হাঁস, তার মধ্যে জেগে ওঠে মহীন (সোহেল মন্ডল)। কোমর পানিতে সূর্যপ্রণামের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে এক রহস্যময়ী নারী (মাসুমা রহমান নাবিলা)। মহীন রুমাল নাকে দিয়ে পাগলের মতো ছুটতে থাকে। এরপর দেখা যায়, গোলাপ ফুল থেকে সুগন্ধি তৈরি হচ্ছে আর সেই তরুণীকে অবাক হয়ে দেখছে মহীন। তারপর শুরু হয় তাদের রহস্যময় কথোপকথন। পরের মুহূর্তেই দেখা যায় নিজের ঘরে, বিছানায় মহীন। চারপাশে ছড়ানো শত শত বই।
মহীন একজন দুষ্প্রাপ্য বই বিক্রেতা ও ভাবুক, যে খুঁজে চলেছে বনলতা সেনকে। গল্পের মধ্যেই তার দেখা হয় জীবনানন্দ গুপ্তের (খায়রুল বাসার) সঙ্গে। গল্প এগোতে থাকলে বোঝা যায় যে সে-ই জীবনানন্দ দাশ। পরে মহীন নিজেই হয়ে উঠেছে একালের জীবনানন্দ দাশ। পর্দায় একে একে আসেন জীবনানন্দের জীবনের উল্লেখযোগ্য মানুষ—শোভনা, মা কুসুমকুমারী দাশ, স্ত্রী লাবণ্য গুপ্ত, এমনকি বুদ্ধদেব বসু, সজনীকান্ত দাস ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তবে মহীন আর জীবনানন্দ কোথাও যেন এক সূত্রে বাঁধা। দুজনই খুঁজে চলেছেন বনলতা সেনকে। তারা কি খুঁজে পান বনলতাকে? নাকি তার আগেই হারিয়ে যান কালের গহ্বরে?
বনলতা চরিত্রের নির্মাণ
‘বনলতা সেন’ সিনেমার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত বনলতা চরিত্রের নির্মাণ। এখানে বনলতা কোনো একক নারী নয়; সে শোভনা, বিশাখা, মুনিয়া, হেলেন কিংবা অন্য কোনো রূপে ফিরে আসে। কখনো সে প্রেম, কখনো স্মৃতি। সে আরাধ্য কিন্তু অধরা। কখনো সে সুগন্ধি কারখানার রহস্যময়ী নারী, কখনো রাখালি, কখনো জেলবন্দী বিপ্লবী, আবার কখনো যৌনপল্লির বিশাখা। এই জটিল চরিত্র ধারণ করতে মাসুমা রহমান নাবিলা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তার অভিনয়ের বড় গুণ সংযম। সংলাপের চেয়ে তার ভিন্নরূপে উপস্থিতিই যেন গল্পকে প্রাণ দিয়েছে। পরিচালক এখানে রহস্যময়তা বজায় রেখেছেন, কিন্তু চরিত্রটিকে কখনো অতি নাটকীয় হতে দেননি। দীর্ঘ সংলাপ, ধীরগতি ও প্রতীকী হওয়া সত্ত্বেও তিনি দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
অভিনয় ও চিত্রায়ণ
জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে খায়রুল বাসারও ভালো করেছেন। তিনি জীবনানন্দ চরিত্রের অন্তর্মুখিতা ও বিষণ্নতা ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে সিনেমার সবচেয়ে বড় চমক সোহেল মন্ডল। গত ঈদে বাণিজ্যিক সিনেমা ‘রাক্ষস’-এ খলচরিত্রে চমকে দেওয়ার পর ‘বনলতা’য় মহীন চরিত্রেও তিনি ভালো করেছেন। বুনো রুক্ষ্ম অভিব্যক্তি দিয়ে অভিনেতা হিসেবে নিজের দক্ষতা তুলে ধরেছেন। মহীন বস্তুত জীবনানন্দের আরেক সত্তা; এই সিনেমা মহীনের বনলতা অন্বেষণের গল্প এবং চরিত্রটির প্রতি সুবিচার করেছেন তিনি। জীবনানন্দের স্ত্রী লাবণ্য গুপ্ত চরিত্রে মাইমুনা মম যথাযথ। শোভনা চরিত্রে রূপন্তী আকিদ ও লীলা নাগ চরিত্রে নাজিবা বাশারও ভালো করেছেন।
সিনেমাটোগ্রাফি নিঃসন্দেহে এই সিনেমার প্রধান সম্পদ। প্রতিটি ফ্রেম অত্যন্ত যত্নে নির্মিত। এখানে নির্মাতার সঙ্গে আলাদাভাবে কৃতিত্ব দিতে হয় চিত্রগ্রাহক রিদয় সরকারকে। কারণ, এই সিনেমার দৃশ্যায়ন যেন জীবনানন্দের কবিতার দৃশ্যরূপ। মহীনের ঘোড়া, কার্তিকের জ্যোৎস্না, শুয়োরের পাল, ফড়িং, ইঁদুর, লাশকাটা ঘর, পাখির নীড়ের মতো চোখ কিংবা কমলালেবু—জীবনানন্দের কবিতার পরিচিত প্রতীকগুলোকে পরিচালক ও চিত্রগ্রাহক অসাধারণভাবে পর্দায় তুলে এনেছেন। আলো-ছায়ার ব্যবহার, ধূসর টোন, পুরোনো সময়ের আবহ ও লোকেশন নির্বাচনের কারণে প্রতিটি ফ্রেম যেন একেকটি জীবন্ত চিত্রকর্ম হয়ে উঠেছে। শিল্পনির্দেশনার কাজও ভালো; কিছু দৃশ্য এতটাই নান্দনিক যে আলাদা করে মনে গেঁথে যায়।
আবহসংগীত ও সম্পাদনা
বাপ্পা মজুমদারের আবহসংগীত চলচ্চিত্রটির আবহ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আবেগকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা এখানে নেই; বরং অনেক ক্ষেত্রে নীরবতাই হয়ে উঠেছে সংগীত। বাতাসের শব্দ, ট্রেনের আওয়াজ কিংবা দূর থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝি পোকার ডাক চলচ্চিত্রের আবেগকে আরও গভীর করেছে। ‘এখানে কেউ নেই, এখানে কেউ থাকে না/ কখনো ছিল না, কখনোই ছিল না/ এখানে কেউ আসে না/ অহেতুক খুঁজো না…’—এমন কথায় সিনেমার একমাত্র গানটি শুনতে যেমন ভালো লেগেছে, তেমনি দৃশ্যধারণও ভাবিয়েছে।
সিনেমাটির গতি বেশ ধীর, তাই কিছু দৃশ্য মনে হয় একটু বেশি দীর্ঘ। জীবনানন্দ দাশের কবিতার অনেক রূপক ও প্রতীক সিনেমাতেও আছে। যারা স্পষ্ট গল্প ও সহজ ব্যাখ্যা পছন্দ করেন, তাদের কাছে সিনেমাটি হয়তো কিছুটা কঠিন মনে হতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে আবার সহজবোধ্য। কিছু তথ্য মূল চরিত্রের মুখ দিয়েই বলানো হয়েছে (যেমন শোভনাকে কবিতার বই উৎসর্গ করেছেন জীবনানন্দ, যেটা আবার নিজের মুখেই তিনি বলেন); সেটা একটু খাপছাড়া মনে হয়েছে।
দুর্বলতা ও সমালোচনা
‘বনলতা সেন’ কবিতায় দুজন বৌদ্ধ শাসকের নাম পাওয়া যায়—মগধের রাজা বিম্বিসার ও মৌর্য সম্রাট অশোক। সিনেমায় জীবনানন্দের জীবনে বৌদ্ধধর্মের সম্ভাব্য প্রভাবের প্রসঙ্গ এনেছেন নির্মাতা। প্রাচীন রাজাদের কিছু দৃশ্যের বিনির্মাণও আছে। এসব জায়গার ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের কাজ দুর্বল। বাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার মিশেল তৈরির সম্পাদনাও মাঝেমধ্যে চোখে লেগেছে। জীবনানন্দের মৃত্যুর পর লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘দ্য লাস্ট সাপার’-এর প্রেরণায় নির্মিত দৃশ্যটি অভিনব কিন্তু কতটা প্রভাব রাখতে পেরেছে? কারণ, দৃশ্যটি যেন জীবনানন্দের বিষোদ্গার সভায় পরিণত হয়। আর শেষে মহীনের যে পরিণতি দেখানো হয়েছে, সেটাও কেমন যেন চোখে লাগে।
‘বনলতা সেন’কে ‘ইউ’ বা সবার উপযোগী সনদ দিয়েছে সার্টিফিকেশন বোর্ড। কিন্তু কিছু কিছু দৃশ্য অপ্রাপ্তবয়সীদের উপযোগী নয়। ‘পিজি ১৩’ বা এ ধরনের কিছু নির্দেশনা থাকলে ভালো হতো।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে ‘বনলতা সেন’ নিঃসন্দেহে একটি সাহসী নির্মাণ। প্রচলিত জীবনীচিত্র এটি নয়, আবার সরাসরি কবিতার রূপান্তরও নয়। পরিচালক শুধু একটি কবিতাকে চলচ্চিত্রে রূপ দিতে চাননি; তিনি চেষ্টা করেছেন কবি জীবনানন্দ দাশের কল্পলোক, স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা, প্রেম, হতাশা ও সময়বোধকে সিনেমার ভাষায় অনুবাদ করতে। বাংলা চলচ্চিত্রে কাব্যিক ভাষা ও নিরীক্ষাধর্মী সিনেমার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে থাকবে ‘বনলতা সেন’।



