গত বছরের অক্টোবরে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে গাজা উপত্যকা থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার করার কথা ছিল ইসরায়েলের। কিন্তু সেনা সরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে ইসরায়েলি বাহিনী অবরুদ্ধ এ উপত্যকায় গোপনে স্থায়ী ও সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে। আল-জাজিরার বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে।
৪০টি সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি
আল-জাজিরার ওপেন সোর্স ইউনিটের একটি অনুসন্ধানে গত মে পর্যন্ত স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে গাজার ভেতর এমন ৪০টি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ বিশ্লেষণ প্রমাণ করে, আটটি ঘাঁটি ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর সম্পূর্ণ নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। এখনো পুরোদমে একটি ঘাঁটির নির্মাণকাজ চলছে।
কবরস্থান ভেঙে ঘাঁটি
গাজার ভূখণ্ড দখলের সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ দেখা গেছে খান ইউনিসে। সেখানকার একটি কবরস্থান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে তার ওপর নতুন সামরিক ঘাঁটি বানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে এ কবরস্থানে মাটি ভরাটের কাজ শুরু হয়। ২০২৬ সালের ১৮ মে–র মধ্যে দেখা যায়, কবরস্থানটিতে একই রকম দেখতে কয়েকটি স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। স্থাপনাগুলোতে সামরিক যানবাহন রাখা। স্থাপনাগুলো সেনা আবাসন ও বৈঠকের জন্য ব্যবহৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর নির্দেশনা
এসব স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টি ইসরায়েল সরকারের ক্রমশ গাজা উপত্যকা দখলে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাই স্পষ্ট করছে। সম্প্রতি এক সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেই গাজা উপত্যকার সিংহভাগ এলাকা স্থায়ীভাবে দখলে নেওয়ার নির্দেশনার কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, 'আমরা এখন হামাসকে চাপে রেখেছি। গাজার ৬০ শতাংশ এলাকা এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে।' সম্মেলনে গাজাকে পুরোপুরি ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করার দাবি জানানো হলে নেতানিয়াহু বলেন, 'আসুন ধাপে ধাপে এগোই। আগে ৭০ শতাংশে যাই। সেখান থেকেই শুরু করি।'
ইয়েলো লাইন ও সামরিক স্থাপনা
গাজার নিরপেক্ষ অঞ্চল ও সামরিক এলাকার প্রায় ৬০ শতাংশ নিয়ে 'ইয়েলো লাইন' নামে পরিচিত একটি সীমারেখা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে ইসরায়েলি বাহিনী এই সীমারেখার মধ্যে নিজেদের অবস্থান সীমিত রেখেছে। নতুন ঘাঁটি নির্মাণের পাশাপাশি ইয়েলো লাইনের ভেতর আগে থেকেই থাকা সামরিক অবস্থানগুলোও দ্রুত সম্প্রসারণ করছে ইসরায়েলি বাহিনী। গাজা নগরীর পূর্বে অবস্থিত একটি সামরিক ঘাঁটির আয়তন ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
জনসাধারণকে অবরুদ্ধ করার কৌশল
গাজাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ৪০টি সামরিক ঘাঁটির অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি ফিলিস্তিনি জনবসতিগুলো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার একটি পরিকল্পিত কৌশল। ঘাঁটিগুলোর একটি আরেকটির সঙ্গে মাটির বাঁধ, পরিখা ও সামরিক সড়কের মাধ্যমে সংযুক্ত। এই অবকাঠামো বেসামরিক মানুষের চলাচল ও নিজেদের জমিতে যাওয়ার সুযোগকে মারাত্মকভাবে খর্ব করছে, বিশেষ করে ইসরায়েলি অবস্থানের কাছাকাছি এলাকাগুলোতে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন
গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত ও ১ লাখ ৭২ হাজার ৯১৯ জন আহত হয়েছেন। হতাহতদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। এ সম্প্রসারিত সামরিক উপস্থিতি ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া ওই চুক্তি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২১ দফা শান্তি পরিকল্পনার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল। চুক্তিতে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ, মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ ও ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছিল।
বিশ্লেষকের মতামত
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল্লাহ আকরাবাবি বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় 'দখল, নিয়ন্ত্রণ ও সীমানা সম্প্রসারণ ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতির মূল অংশে পরিণত হয়েছে।' তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের নতুন কৌশল হলো এমন একটি অঞ্চল গড়ে তোলা, যেখান থেকে ফিলিস্তিনি জনগণ ও নগর অবকাঠামো পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হবে।



