ভারতে জন্মহার কমছে, বাড়ছে শঙ্কা: শ্রমশক্তি সঙ্কট ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশঙ্কা
ভারতে জন্মহার কমছে, বাড়ছে শঙ্কা: শ্রমশক্তি সঙ্কটের আশঙ্কা

ভারতে প্রথমবারের মতো প্রজনন হার জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সীমার নিচে নেমে গেছে। একসময় দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য পরিচিত দেশটি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর ফলে ভবিষ্যতে শ্রমশক্তি সংকুচিত হতে পারে, দ্রুত বাড়তে পারে প্রবীণ জনগোষ্ঠী এবং পরিবর্তিত হতে পারে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যও।

প্রজনন হারে ঐতিহাসিক পতন

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভারতের জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান, বিশেষ করে স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসআরএস), অনেক দিন ধরেই দেখিয়ে আসছিল যে দেশটিতে প্রজনন হার কমছে। তবে এতদিন সেই হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা ধরে রাখার মতো পর্যায়ে ছিল। এবার সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। গত মাসে ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেনসাস কমিশনারের দপ্তর প্রকাশিত সর্বশেষ এসআরএস প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের মোট প্রজনন হার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট—টিএফআর) প্রতি নারীর ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৯-এ নেমে এসেছে। অথচ দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় প্রতিস্থাপন হার ২ দশমিক ১। টিএফআর বলতে একজন নারী তাঁর জীবদ্দশায় গড়ে কত সন্তানের জন্ম দিতে পারেন, সেই সংখ্যাকে বোঝায়। ২০০০-এর দশকে ভারতে প্রতি নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৩।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কেন কমছে জন্মহার?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার প্রসার, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সহজলভ্যতা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সন্তান প্রতিপালনের ক্রমবর্ধমান ব্যয়— এই চারটি কারণই জন্মহার কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। ভারতের সামাজিক নীতি নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ দীপা সিনহা বলেন, ‘সমাজে যখন নারীরা বেশি শিক্ষা, জন্মনিয়ন্ত্রণ সুবিধা এবং পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পান, তখন সাধারণত মোট প্রজনন হার কমে যায়। একই সঙ্গে অর্থনীতি ব্যয়বহুল হয়ে উঠলে সন্তান লালন-পালনের খরচও বৃদ্ধি পায়, যা জন্মহার কমিয়ে দেয়।’ তার মতে, শিশুমৃত্যুর হার কমে যাওয়াও একটি বড় কারণ। সর্বশেষ এসআরএস প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে ভারতে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩০। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৪-এ। ফলে পরিবারগুলো আগের মতো বেশি সন্তান নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আঞ্চলিক বৈষম্য

তবে এই পরিবর্তন দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে ঘটছে না। প্রজনন হারে স্পষ্ট আঞ্চলিক বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। মে মাসে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, উত্তর ভারতের দরিদ্র রাজ্য বিহারে দেশের সর্বোচ্চ প্রজনন হার ২ দশমিক ৯। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে উত্তর প্রদেশ, যেখানে এই হার ২ দশমিক ৬। বিপরীতে শিক্ষায় ও স্বাস্থ্যসেবায় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকা নয়াদিল্লিতে এই হার মাত্র ১ দশমিক ২। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু ও কেরালায় প্রতি নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার ১ দশমিক ৩। দীপা সিনহার মতে, ১৯৮০-এর দশক থেকে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নারীর সামাজিক অবস্থানের ক্ষেত্রে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। নিম্ন প্রজনন হারের পেছনে এটিই প্রধান কারণ।

জনমিতিক সুবিধা ও অর্থনীতি

ভারত ২০০৫ সালে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুবিধার যুগে প্রবেশ করে। এটি এমন একটি সময়, যখন কর্মক্ষম বয়সী মানুষের সংখ্যা শিশু ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি থাকে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) তথ্য অনুযায়ী, ভারতের এই সুবিধাজনক সময়কাল ২০৫৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। জাপান, সিঙ্গাপুর ও হংকং ১৯৬০-এর দশকে এবং চীন ১৯৮০-এর দশকে এই পর্যায়ে প্রবেশ করে দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছিল। বর্তমানে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। ভারতের ক্ষেত্রেও জনমিতিক সুবিধা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। তবে দেশটিতে এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার এবং চীনের মতো উন্নয়নের স্তরে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জন্মহার ক্রমাগত কমতে থাকলে ভারত হয়তো এই জনমিতিক সুবিধার পূর্ণ সুফল আর পাবে না। দীপা সিনহা বলেন, ‘যদি কম শিশু জন্ম নেয়, তাহলে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বছর পর ভারতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হবে। তাঁরা শ্রমবাজারে ততটা অংশ নিতে পারবেন না। এতে দেশের কর্মশক্তির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।’

রাজনৈতিক প্রভাব

জনসংখ্যার এই পরিবর্তন ভারতের রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উর্বরতার হারে বড় পার্থক্যের অর্থ হলো, উত্তর ভারতের জনবহুল রাজ্যগুলো ভবিষ্যতে দেশের মোট জনসংখ্যার আরও বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করবে। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে কেন্দ্রীয় সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার, তাদের তুলনায় কম অর্থ বরাদ্দ দিয়ে কার্যত শাস্তি দিচ্ছে। দীপা সিনহার মতে, কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আর্থিক সম্পদ বণ্টন ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হতে পারে। এ বছরের শেষ দিকে ভারত সরকার সংসদে ‘ডিলিমিটেশন’ বা নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ নীতি উপস্থাপন করবে। নতুন জনগণনার ভিত্তিতে প্রতিটি রাজ্যের জনসংখ্যা অনুযায়ী সংসদীয় আসন পুনর্বণ্টন করা হবে। জনগণনা কার্যক্রম এ বছর শুরু হয়েছে এবং ২০২৭ সালে শেষ হওয়ার কথা। সিনহা বলেন, ‘ডিলিমিটেশন কার্যকর হলে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর সংসদীয় আসনের অংশ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।’

ধর্মীয় রাজনীতি ও জনসংখ্যা

ভারতে জনসংখ্যা নিয়ে ধর্মীয় রাজনীতিও নতুন কোনো বিষয় নয়। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দীর্ঘদিন ধরে এমন ধারণা প্রচার করেছে যে মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় বেশি সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। এর ফলে একদিন মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যেতে পারেন—এমন আশঙ্কাও কিছু মহলে ছড়িয়ে পড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত হিন্দু দম্পতিদের অন্তত তিন থেকে চারটি সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানান। তার দাবি ছিল, এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে হিন্দু সমাজের সম্ভাব্য অবক্ষয় ঠেকানো সম্ভব হবে। তবে সরকারি তথ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ২০১১ সালের সর্বশেষ জনগণনা অনুযায়ী, ভারতের মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ মুসলমান। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মুসলমানদের উর্বরতার হার ৪ দশমিক ৪১ থেকে কমে ২ দশমিক ৩৬-এ নেমে এসেছে। একই সময়ে হিন্দুদের ক্ষেত্রে তা ৩ দশমিক ৩ থেকে কমে ১ দশমিক ৯৪ হয়েছে। সর্বশেষ জরিপে আরও দেখা গেছে, দেশের সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই জন্মহার দ্রুত কমছে।

সরকারের উদ্যোগ

কমতে থাকা জন্মহার মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকার এখনো কোনো জাতীয় নীতি ঘোষণা করেনি। তবে কয়েকটি রাজ্য সরকার সন্তান জন্মদানে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। গত মাসে অন্ধ্র প্রদেশ সরকার ঘোষণা করেছে, কোনো পরিবারে তৃতীয় সন্তান জন্ম নিলে ৩০ হাজার রুপি এবং চতুর্থ সন্তান জন্ম নিলে ৪০ হাজার রুপি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এসআরএস তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটির মোট প্রজনন হার বর্তমানে ১ দশমিক ৪। এ ছাড়া গোয়া, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানায় প্রথমবারের মতো সন্তান নিতে আগ্রহী দম্পতিদের জন্য সরকার-অর্থায়িত আইভিএফ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

দীপা সিনহার মতে, মানুষের ব্যক্তিগত প্রজননসংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে সম্মান করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্যও প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘ভারতের মতো দেশগুলোর জন্য তাদের জনমিতিক কাঠামো ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের ভিত্তিতে জননীতি তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমরা একটি বয়স্ক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হতে যাচ্ছি, তাহলে বিপুলসংখ্যক প্রবীণ মানুষের সহায়তার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’ তার মতে, এখনই এমন নীতি প্রয়োজন, যা প্রবীণদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

এশিয়ার অন্যান্য দেশ

শুধু ভারত নয়, এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশও দ্রুত কমে যাওয়া জন্মহারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চীনের প্রজনন হার ১, যা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ২ দশমিক ১-এর অনেক নিচে। তাইওয়ানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মোট প্রজনন হার প্রায় ০.৮৬ এবং তা আরও কমতে পারে। অন্যদিকে জাতিসংঘের তথ্য বলছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতি নারীর গড় সন্তানসংখ্যা মাত্র ০.৭৫, যা বর্তমানে বিশ্বের সর্বনিম্ন উর্বরতার হার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে গেছে। একদিকে কমছে জন্মহার, অন্যদিকে দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে সমাজ। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হিসেবে ভারতের অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং রাজনীতি এই পরিবর্তনের সঙ্গে কতটা সফলভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, সেটিই আগামী কয়েক দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে যাচ্ছে।